আক্রমণ করেছিল, তাদের উদ্দেশ্য ছিল আশ্রয় লাভ করা। চীন-সাম্রাজাও যখনই সুযোগ পেয়েছে—যেমন হান বংশের রাজত্বকালে—যাযাবর জাতিগুলোকে তাড়িয়ে দিয়েছে দেশ থেকে।
আর-একটা কথা মনে রাখবে, মধ্য-এশিয়ার এইসমস্ত যাযাবর জাতি ভারতবর্ষকে পুরোপুরি শত্রুর দেশ বলে মনে করে নি। ইতিহাসে এদের বলা হয়েছে বর্বর; সে যুগের ভারতের তুলনায় এরা অবশ্য ততটা সভ্যভব্য ছিল না। কিন্তু অধিকাংশ জাতিই ছিল গোঁড়া বৌদ্ধধর্মাবলম্বী, এবং ভারতবর্ষ এদের ধর্মের জন্মভূমি হওয়াতে এরা ভারতকে খুব শ্রদ্ধা করত।
পুষ্যমিত্রের রাজত্বকালেও ব্যাক্ট্রিয়ার গ্রীক রাজা মিনান্দার ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল আক্রমণ করেছিলেন। ইনি ছিলেন বৌদ্ধ। ব্যাক্ট্রিয়া ছিল ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে। প্রথমে সেলিউকসের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু পরে স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়। পুষ্যমিত্রের নিকট পরাজিত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু মিনান্দার কাবুল আর সিন্ধুদেশ অধিকার করতে সমর্থ হন।
ব্যাক্ট্রিয়াবাসীদের পরে এল শকজাতি। শকেরা উত্তর এবং পশ্চিম-ভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। এরা ছিল তুর্কি যাযাবর জাতির একটা শাখা; কুষাণজাতি এদের স্থানচ্যুত করেছিল। ব্যাক্ট্রিয়া, পার্থিয়া প্রভৃতি রাজ্য পদদলিত করে শকেরা এ দেশে এসে উত্তরাঞ্চলে, বিশেষত পাঞ্জাব, রাজপুতানা এবং কাথিয়াওয়াড়ে রাজ্য স্থাপন করে। ক্রমে এরা যাযাবর জাতির রীতিনীতি পরিত্যাগ করে এবং সভ্য জাতিতে পরিণত হয়।
এই সময়ের ইতিহাসে একটা বিষয় প্রণিধানযোগ্য। সেটা এই যে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তুর্কি, ব্যাক্ট্রীয় প্রভৃতি বিদেশী জাতি রাজত্ব করলেও ইন্দো-আর্য সমাজব্যবস্থায় তেমন কোনো ওলটপালট কখনও হয় নি। এরা ছিল বৌদ্ধ এবং বৌদ্ধসংঘব্যবস্থাই মেনে চলেছে; আর ঐসকল বৌদ্ধসংঘ তো প্রাচীন ভারতের গণতান্ত্রিক গ্রাম্য সমাজব্যবস্থার উপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। সুতরাং এদের রাজত্বকালেও এ দেশে স্বায়ত্তশাসনমূলক গ্রাম্য শাসনব্যবস্থাই প্রচলিত ছিল। তখনও বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও শিক্ষার কেন্দ্ররূপে তক্ষশীলা আর মথুরার খুব নামডাক ছিল, চীন এবং পশ্চিম-এশিয়া থেকে শিক্ষার্থীরা ওখানে আসত।
কিন্তু উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকে পুনঃপুনঃ আক্রমণের ফলে এবং মৌর্য সাম্রাজ্যে ভাঙন ধরাতে প্রাচীন ভারতীয় পদ্ধতি ক্রমে এ অঞ্চল থেকে অন্তর্হিত হয়; দাক্ষিণাত্যের ভারতীয় রাষ্ট্রগুলোই খাঁটি ইন্দো-আর্য প্রথার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। বহু গুণীজ্ঞানী লোক উত্তরাঞ্চল থেকে চলে যায় দাক্ষিণাত্যে। হাজার বৎসর পরে যখন মুসলমানগণ ভারত আক্রমণ করে তখনও ঠিক এই ব্যাপার ঘটেছিল। এই দেখো-না কেন, আজও পর্যন্ত উত্তর-ভারতই ঐসমস্ত আক্রমণের ফল ভোগ করছে, দাক্ষিণাত্যে বড়ো একটা আঁচড় লাগে নি। আমরা উত্তর ভারতের বাসিন্দারা একটা মিশ্র সংস্কৃতির আবহাওয়ায় গড়ে উঠেছি; এটা হিন্দু, মুসলিম সংস্কৃতির মিশ্রণ এবং তাতে আবার পাশ্চাত্যের ঢেউ এসে লেগেছে। এমনকি আমাদের ভাষাও মিশ্র ভাষা, তাকে হিন্দি, অথবা উর্দু কিংবা হিন্দুস্থানি যাই বলো-না কেন। অথচ দাক্ষিণাত্য আজও হিন্দু প্রধান, অধিবাসীরা বেজায় নিষ্ঠাপরায়ণ, সে তো তুমি নিজেই দেখেছ। শত শত বৎসর ধরে দাক্ষিণাত্য প্রাচীন আর্যসভ্যতার ধারা বজায় রাখতে চেষ্টা করেছে, এবং তার ফলে এমন এক কঠোর মনোবৃত্তিসম্পন্ন সমাজের সৃষ্টি হয়েছে যে তার পরমত-অসহিষ্ণুতা দেখলে অবাক লাগে। দেয়াল জিনিষটা ভয়াবহ; কখনও কখনও বাইরের বিপদ থেকে রক্ষা করলেও, শেষ পর্যন্ত মানুষকে বন্দী আর ক্রীতদাসে পরিণত করে; স্বাধীনতার বিনিময়ে তখন তোমাকে কিনতে হয় শুচিতা আর পবিত্রতা। আর মনের মধ্যে যদি একবার দেয়াল খাড়া করে তুলতে পারো তবে সেটা হবে আরও সাংঘাতিক; প্রাচীন কালের কোনো কুপ্রথাকেই তুমি ছাড়তে পারবে না, আবার নূতন চিন্তা বা আদর্শকে গ্রহণ করতেও তোমার বাধবে।
কিন্তু তথাপি দাক্ষিণাত্য একটা কাজের মতো কাজ করেছে, সহস্রাধিক বৎসর কাল যাবৎ শিল্পকলা ধর্ম আর রাজনীতিতে ভারতীয় আর্যসভ্যতার ধারা রক্ষা করেছে। প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলার নিদর্শন দেখতে চাও তো তোমাকে দক্ষিণ ভারতে যেতে হবে। আর রাজনীতির দিক থেকে