বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৯২

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৭৪
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

দাক্ষিণাত্যের গণতান্ত্রিক সংসদগুলো যে রাজশক্তিকে সংযত রাখত, সে কথা তো মেগাস্থেনিসের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত থেকেই আমরা জানতে পারি।

 কেবল যে জ্ঞানী লোকেরাই উত্তর-ভারত ছেড়ে দাক্ষিণাত্যে চলে গিয়েছিল তা নয়; শিল্পী, কারিকর, মিস্ত্রি প্রভৃতি অনেক গুণী লোকও মগধের পতনের পরে দাক্ষিণাত্যে চলে যায়। এই সময়ে দাক্ষিণাত্যের সহিত ইউরোপের বাণিজ্য চলত। এ দেশ থেকে সোনা, মুক্তা, হাতির দাঁত, চাল, লঙ্কা, ময়ূর, এমনকি বানরও বাবিলন মিশর গ্রীস এবং রোমে রপ্তানি করা হত। মালাবার উপকূল থেকে সেগুন কাঠ চালান দেওয়া হত বাবিলনে। আর-একটা কথা খেয়াল করবে যে, ভারতের নিজস্ব জাহাজে করেই এই ব্যবসাবাণিজ্য চলত। জাহাজের খালাসি ছিল যত দ্রাবিড়—জাতির লোক। এ থেকেই বুঝতে পারছ, সেই প্রাচীন যুগের পৃথিবীতে দাক্ষিণাত্যের স্থান কত উপরে ছিল। অসংখ্য রোমান মুদ্রা দক্ষিণ ভারতে পাওয়া গেছে। আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি, মালাবার উপকূলে আলেকজান্দ্রিয়ার উপনিবেশ ছিল, আর ওদিকে ভারতীয় উপনিবেশ ছিল আলেকজান্দ্রিয়ায়।

 অশোকের মৃত্যুর কিছু পরেই দাক্ষিণাত্যে অন্ধ্রজাতি শক্তিশালী সাম্রাজ্য স্থাপন করে। ভারতের পূর্ব-উপকূলে এবং মাদ্রাজের উত্তরে এই অন্ধ্রদেশ; বর্তমানে অন্ধ্র একটি কংগ্রেসী প্রদেশ, তা তুমি জানো। অন্ধ্রদেশের ভাষা তেলেগু। অশোকের মৃত্যুর পরে এই সাম্রাজ্য অতি দ্রুত বিস্তার—লাভ করে। উপনিবেশ স্থাপনের ব্যাপারে দাক্ষিণাত্য কীরূপ উদ্যোগী হয়েছিল সে কথা পরে বলব।

 শক, সিথিয়াবাসী প্রভৃতি জাতির কথা তোমাকে বলেছি; এরা ভারতবর্ষ আক্রমণ করে এবং উত্তর-ভারতে বসবাস করতে থাকে। কালক্রমে এরা ভারতেরই অঙ্গীভূত হয়ে যায়; আমরা উত্তরভারতের বাসিন্দারা যেমন আর্যদের বংশধর তেমনি আবার ওদেরও বংশধর। বিশেষ করে, সাহসী রাজপুত জাতি আর কাথিয়াওয়াড়ের কর্মঠ অধিবাসীরা তো এদেরই সন্তানসন্ততি।


৩০

কুষাণ-সাম্রাজ্য

১১ই এপ্রিল, ১৯৩২

 শক আর তুর্কি জাতি কর্তৃক পুনঃপুনঃ ভারত-আক্রমণের কথা গত চিঠিতে বলেছি। দাক্ষিণাত্যে অন্ধ্রজাতির প্রবল হয়ে ওঠার কথাও উল্লেখ করেছি; এই জাতি এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং সেটা বঙ্গোপসাগর থেকে আরবসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কুষাণদের নিকট তাড়া খেয়েই শকেরা এ দেশে এসেছিল; কিছুকাল পরে আবার কুষাণরা নিজেরাই এসে হাজির হল। খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে কুষাণজাতি ভারতের সীমান্তে এক রাজ্য স্থাপন করে; এই রাজ্যই কালক্রমে বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। দক্ষিণে বারাণসী ও বিন্ধ্যপর্বত, উত্তরে ইয়ারখন্দ ও খোটান, আর পশ্চিমে পারশ্য এবং পার্থিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত, অর্থাৎ মধ্য-এশিয়া থেকে বারাণসী পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। কুষাণজাতি তিন শো বৎসর কাল রাজত্ব করেছিল। কুষাণ-সাম্রাজ্য আর দাক্ষিণাত্যের অন্ধ্র- সাম্রাজ্য সমসাময়িক। প্রথমে কুষাণ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কাবুলে; পরে পুরুষপুরে (বর্তমান পেশোয়ার) স্থানান্তরিত হয়।

 কুষাণ-সাম্রাজ্যের ইতিহাস অনেক কারণে চিত্তাকর্ষক। কুষাণ-সম্রাটদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ ছিলেন কনিষ্ক; ইনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্র তক্ষশীলা রাজধানী পেশোয়ারের নিকটে অবস্থিত ছিল। কুষণেরা ছিল মঙ্গোলীয় কিংবা তৎসংশ্লিষ্ট জাত। কুষাণ রাজধানী থেকে নিশ্চয়ই লোকজন সর্বদা মঙ্গোলিয়ায় যাতায়াত করত; সেই কারণেই বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতি চীন এবং মঙ্গোলিয়ায় পৌঁচেছিল। পশ্চিম-এশিয়াও নিশ্চয় এইভাবেই বৌদ্ধ