বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৯৪

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৭৬
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

আদর্শ ও চিন্তাধারার সংস্পর্শে এসেছিল। আলেকজাণ্ডারের সময় থেকেই পশ্চিম-এশিয়া ছিল গ্রীক-শাসনাধীনে, কাজে কাজেই গ্রীক সভ্যতারও আমদানি হয়েছিল ওখানে। সেই গ্রীক-এশিয়াটিক সভ্যতা এখন ভারতীয়-বৌদ্ধ সভ্যতার সঙ্গে মিশ খেয়ে গেল।

 দেখা যাচ্ছে, চীন আর পশ্চিম-এশিয়ার উপরে ভারতবর্ষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। তেমনি আবার ভারতের উপরে এই দেশের ছাপ পড়েছিল। মনে করো, কুষাণ সাম্রাজ্য এক বিরাট মূর্তি, এশিয়ার পিঠের উপরে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে; পশ্চিমে গ্রীস-রোম সাম্রাজ্য, পূবদিকে চীন, আর দক্ষিণে ভারতবর্ষ। এ যেন ছিল ভারতবর্ষ ও রোম এবং ভারতবর্ষ ও চীনের মধ্যবর্তী একটি বিশ্রামগৃহ।

 এইরূপে কেন্দ্রস্থলে অবস্থানের দরুন ভারতবর্ষ আর রোমের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। ভারতে যখন কুষাণ-রাজত্ব তখন রোমে জুলিয়াস সিজার বেঁচে ছিলেন; প্রজাতন্ত্র যুগ শেষ হয়ে রোমে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কথিত আছে, কুষাণ-সম্রাট রোমে অগাস্টাস সিজারের রাজসভায় দূত পাঠিয়েছিলেন। উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য চলত। ভারতবর্ষ থেকে নানা সুগন্ধি, রেশম, মসলিন, বহুমূল্য বস্ত্রাদি রোমে চালান দেওয়া হত। রোম থেকে সোনা আমদানি হত এ দেশে। প্লিনি নামে রোমের এক গ্রন্থকার সোনা-রপ্তানির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ঐ রপ্তানির ফলে রোম বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হত।

 এই সময়ে বৌদ্ধসংঘের অধিবেশনে এবং আশ্রমগুলোতে ধর্মবিষয়ে মতভেদ দেখা দেয়। দক্ষিণ আর পশ্চিম অঞ্চল থেকে নূতন নূতন চিন্তাধারা কিংবা পুরোনো আদর্শই নূতন আকারে আমদানি হচ্ছিল এবং তাতে করে আদর্শের মধ্যে একটু জটিলতা এসে গেল। ক্রমে বৌদ্ধদের মধ্যে মতভেদ ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধগণ দুই শাখায় বিভক্ত হয়; এক শাখা ‘মহাযান’ এবং অপর শাখা ‘হীনযান’ মত অবলম্বন করে। এর ফলে লোকের ধর্ম ও জীবনাদর্শে একটা পরিবর্তন দেখা দিল এবং সেটা পরিস্ফুট হয়ে উঠল শিল্পে স্থাপত্যে। কী করে এই পরিবর্তন ঘটল তা বলা শক্ত; তবে সম্ভবত ব্রাহ্মণ্য আর যাবনিক আদর্শ বৌদ্ধ চিন্তাধারার মোড় ফিরিয়ে দিয়েছিল।

 আসলে বৌদ্ধধর্মটা কী? ওটা শ্রেণীবিভাগ, পুরোহিত-প্রথা আর আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির একটা বিরুদ্ধ মতবাদ মাত্র, এ কথা তোমাকে পূর্বেও বলেছি। গৌতম ছিলেন মূর্তিপূজার বিরোধী। তিনি নিজেকেও দেবতা বলে দাবি করেন নি। তিনি ছিলেন জ্ঞানী, বুদ্ধ। এই মনোভাবের দিক থেকে বুদ্ধ কোনো মূর্তিতে প্রকাশ পান নি; সুতরাং সে যুগের স্থাপত্যশিল্পেও কোনো মূর্তির স্থান ছিল না। কিন্তু ব্রাহ্মণেরা হিন্দু আর বৌদ্ধধর্মের বিভেদ ঘোচাবার জন্যে বরাবর চেষ্টা করেছে এবং সেই উদ্দেশ্যে বৌদ্ধধর্মের মধ্যে হিন্দু আদর্শ প্রবর্তন করতে চেয়েছে। গ্রীস-রোম থেকে যেসকল কারিগর এ দেশে এসেছিল তাদের দিয়ে দেবমূর্তি গড়ানো হত। এভাবেই ক্রমে বৌদ্ধ-মন্দিরে-মন্দিরে মূর্তি গড়ে উঠতে লাগল। প্রথমে বোধিসত্ত্বের বিগ্রহ, কেননা বুদ্ধ পূর্ব-পূর্ব জন্মে বোধিসত্ত্ব ছিলেন বলে লোকে বিশ্বাস করত; তার পরে ক্রমে স্বয়ং বুদ্ধের মূর্তি তৈরি হল, লোকে দেবতাজ্ঞানে তাঁর পূজা করতে লাগল।

 মহাযান-শাখা এইসব পরিবর্তনের পক্ষপাতী ছিল। কুষাণ-সম্রাটগণ মহাযান-মত অবলম্বন করেন। কিন্তু তাই বলে ওরা হীনযান কিংবা অন্যান্য ধর্মমতের প্রতি মোটেই অসহিষ্ণু ছিলেন না। কনিষ্ক তো নাকি জরথুস্ট্রের ধর্ম প্রচারেও উৎসাহ দেখাতেন।

 মাঝে মাঝে বৌদ্ধসংঘের অধিবেশনে মহাযান আর হীনযান এই দুই মতবাদ সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা হত। কনিষ্ক কাশ্মীরে সংঘের এক সাধারণ অধিবেশন আহ্বান করেছিলেন। কয়েক শো বছর ধরে এই দুটি মতবাদের মধ্যে বিরোধ চলেছিল। উত্তর-ভারতের বোধগণ মহাযান আর দক্ষিণ ভারতের বৌদ্ধগণ হীনযান মত অবলম্বন করে; অবশেষে উভয় মতবাদই হিন্দু ধর্মের সঙ্গে মিশে যায়। বর্তমানে চীন জাপান তিব্বতে মহাযান-পন্থা প্রচলিত। সিংহল এবং ব্রহ্মদেশের বৌদ্ধরা হীনযান মতাবলম্বী।

 প্রত্যেক জাতির শিল্পকলার মধ্যে জাতির মানসিক গতির পরিচয় পাওয়া যায়। গোড়ার দিকে বৌদ্ধধর্মের চিন্তা এবং ভাবধারা অত্যন্ত সহজ সরল অনাড়ম্বর ভাবেই প্রকাশ পেয়েছিল।