বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৯৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
যিশুখৃষ্ট ও তাঁর ধর্ম
৭৭

ক্রমে বৌদ্ধ-প্রচারকের দল সহজ পথ ছেড়ে নানারকম রূপকের সাহায্যে মর্মব্যাখ্যা করতে লাগলেন। তার ফলে ভারতীয় শিল্পকলাও ক্রমেই অলংকারবহুল হয়ে উঠতে লাগল। বিশেষ করে উত্তরপশ্চিম সীমান্তে গান্ধার প্রদেশে মহাযান-সম্প্রদায়ের যে স্থাপত্যশিল্প গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারুকার্য ক্রমেই বেড়ে চলেছিল। এমনকি হীনযানদের স্থাপত্যশিল্পও এর ছোঁয়াচ থেকে সম্পূর্ণ রক্ষা পায় নি। এদের শিল্পের মধ্যে যে অনাড়ম্বর সরলতাটুকু ছিল তা দূর হয়ে ক্রমেই আলংকারিক কারুকলার প্রয়াস দেখা দিতে লাগল।

 সে যুগের কিছু কিছু শিল্পনিদর্শন এখনও বর্তমান রয়েছে। এর মধ্যে অজন্তার প্রাচীর-চিত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 কুষাণদের কাছ থেকে এবার আমাদের বিদায় নিতে হবে। কিন্তু একটি কথা মনে রেখো; সাধারণত বিদেশীরা এসে বিজিত দেশকে যেভাবে শাসন করে থাকে কুষাণরা ঠিক সেভাবে ভারতবর্ষ শাসন করে নি। একে তো ধর্মের যোগ থাকাতে ভারতীয়দের সঙ্গে তাদের অমনিতেই আত্মীয়তার বন্ধন ছিল, তা ছাড়া কুষাণরা আবার রাজ্যচালনার ব্যাপারে আর্যদেরই রীতিনীতি, শাসনপ্রণালী সব-কিছু অবলম্বন করেছিল। অনেক পরিমাণে আর্যদের চালচলন রীতিনীতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিল বলেই প্রায় তিন শো বছর ধরে এরা উত্তর-ভারতে রাজত্ব করতে পেরেছিল।


৩১

যিশুখৃষ্ট ও তাঁর ধর্ম

১২ই এপ্রিল, ১৯৩২

 এ যাবৎ খৃষ্টপূর্ব যুগের কথাই বলে এসেছি; এবারে আমরা খৃস্টীয় আমলে উপনীত হলাম। খৃষ্টের জন্মের কল্পিত তারিখ থেকে এই যুগের শুরু। প্রকৃতপক্ষে এই তারিখের চার বছর আগে খৃষ্টের জন্ম হয়েছিল। অবশ্য এতে কিছু এসে যায় না। খৃষ্টজন্মের পরেকার সময়ের উল্লেখ করতে সাধারণত A. D.—Anno Domini—অর্থাৎ ‘প্রভুখৃষ্টের বৎসরে’ কথা ব্যবহৃত হয়। এই কথা ব্যবহার করায় ক্ষতি নেই। তবে আমার মনে হয়, এই যুগের উল্লেখ করতে A.C—After Christ—অর্থাৎ ‘খৃষ্টোত্তর’ কথা ব্যবহার করা অধিকতর বিজ্ঞানসম্মত হবে; কেননা খৃষ্ট জন্মের পূর্বেকার সময় বোঝাতে ব্যবহৃত হয় B.C. যাই হোক, আমি A. C. কথাই ব্যবহার করব।

 খৃষ্ট অথবা যিশুর কাহিনী বাইবেলের নিউ টেস্টামেণ্টে বর্ণিত হয়েছে। ঐসকল বিবরণ থেকে খৃষ্টের ছেলেবেলা সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানা যায় না; শুধু জানা যায় যে, নেজারেথ-নামক স্থানে তাঁর জন্ম হয়, গ্যালিলিতে তিনি ধর্মপ্রচার করেন এবং ত্রিশ বৎসর বয়সে জেরুজালেমে উপস্থিত হন। কিছুকাল পরেই তাঁর বিচার হয় এবং রোমান শাসনকর্তা পণ্টিয়স পিলেট তাঁকে শাস্তি দেন। ধর্ম-প্রচার শুরু করার আগে যিশু কী করেছিলেন, কোথায়ই-বা গিয়েছিলেন তা সঠিক জানা যায় না। মধ্য-এশিয়া, কাশ্মীর, লাডাক, তিব্বত প্রভৃতি স্থানে আজও লোকে মনে করে, যিশু ঐসমস্ত অঞ্চল পরিভ্রমণ করেছিলেন; কারও কারও ধারণা, তিনি ভারতবর্ষেও এসেছিলেন। অবশ্য এ বিষয়ে সঠিক কিছুই বলবার উপায় নেই এবং তাঁর জীবনেতিহাস সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা এ কথা বিশ্বাস করেন না। তথাপি কথাটা একেবারে উড়িয়ে দেবার মতোও নয়। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি, বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় সেকালে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিল। দেশবিদেশ থেকে ছাত্ররা এখানে বিদ্যালাভ করতে আসত; সুতরাং সে উদ্দেশ্যে যিশুও হয়তো-বা এসেছিলেন। কোনো কোনো বিষয়ে