যিশুর ধর্মোপদেশের সঙ্গে গৌতমের ধর্মের সাদৃশ্য এত বেশি যে, মনে হয়, বৌদ্ধধর্মের কথা নিশ্চয়ই তাঁর বেশ ভালো জানা ছিল। তবে ভারতে না এসেও যিশু এসব কথা জেনে থাকবেন, কেননা অন্যান্য দেশেও তখন বৌদ্ধধর্মের প্রচার হয়েছিল।
এই পৃথিবীতে ধর্মের জন্যে অনেক বিরোধ, অনেক যুদ্ধবিগ্রহ ঘটেছে, এ কথা স্কুলের ছাত্ররাও জানে। কিন্তু তথাপি এই ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ধর্মগুলো শুরুতে কীরকম ছিল তা আলোচনা করা যেতে পারে। ধর্মগুলোর পারস্পরিক তুলনা চিত্তাকর্ষক। তুলনা করলে দেখা যায়, ধর্ম সমূহের অন্তর্নিহিত বাণী ও ভাবের মধ্যে অনেকাংশে সাদৃশ্য আছে; অথচ কেন যে লোকে ধর্মের খুঁটিনাটি এবং তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে বিরোধ বাধায়, ভেবে পাই নে। আসল কথা এই, গোড়ায় ধর্ম যে আকারে থাকে পরবর্তী কালে গোঁজামিল দিয়ে দিয়ে তাকে একেবারে বিস্তৃত করে ফেলা হয় এবং শেষকালে ধর্মের প্রকৃত রূপটা চেনাই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। ধর্মগুরুর স্থান গ্রহণ করে যত নীচমনা ধর্মান্ধ লোক। অনেক সময়ে আবার ধর্ম রাজনীতি ও সাম্রাজ্যবাদের সহায় হয়েছে। প্রাচীনকালে রোমে অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের উপরে খুব জোর দেওয়া হত। জনগণ যদি গোঁড়া কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয় তা হলে তাদের শোষণ করা আর দাবিয়ে রাখা সহজ ব্যাপার কিনা। ইতালীয় রাজনীতিবিদ্ মেকিয়াভেলি বলেছেন, শাসনব্যাপারেও ধর্মের প্রয়োজন আছে; কর্তব্যের খাতিরে রাজাকেও একটা ধর্ম মেনে চলতে হতে পারে, হোক না সে ধর্ম ঝুটা। ধর্মের খোলসে সাম্রাজ্যবাদের অভিযান আধুনিক কালেও অনেক হয়েছে। সুতরাং কার্ল মার্ক্স্ যে লিখেছেন, ধর্ম জনগণের পক্ষে আফিমের মতো, এতে অবাক হবার কিছু নেই।
যিশু ছিলেন একজন ইহুদি। এই ইহুদিরা এক অদ্ভুত নাছোড়বান্দা জাতের লোক। ডেভিড আর সলোমনের সময়ে ওদের অবস্থার সামান্য উন্নতি হয়েছিল; তার পরেই এল দারণ দুঃসময়। কিন্তু এই স্বল্পকালস্থায়ী শুভক্ষণকেই ইহুদিরা একটা স্বর্ণযুগ বলে কল্পনা করে নিলে; ভবিষ্যতে যথাসময়ে আবার ঐ যুগে ফিরে আসবে, ইহুদিজাতি আবার বড়ো ও ক্ষমতাশালী হবে, এই হল তাদের স্বপ্ন। রোম সাম্রাজ্য এবং অন্যত্র ইহুদিরা ছড়িয়ে পড়ল; অদূর ভবিষ্যতে একজন মেজায়া বা ত্রাণকর্তার আবির্ভাবের সঙ্গে তাদের জীবনে শুভদিন আসবে, এই দৃঢ় বিশ্বাস তারা হারাল না। এদের না ছিল ঘরবাড়ি, না ছিল আশ্রয়; অকথ্য অত্যাচার উৎপীড়ন হয়েছে এদের উপরে; হত্যা করা হয়েছে কত ইহুদিকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই জাতি কী করে দু হাজার বছর-কাল টিঁকে ছিল, বজায় রেখেছিল নিজের বৈশিষ্ট্য, সেটা ইতিহাসে অতি বিস্ময়কর ব্যাপার।
ইহুদিরা একজন ত্রাণকর্তার প্রতীক্ষায় ছিল এবং সম্ভবত যিশুর উপরেই ছিল তাদের আশাভরসা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিরাশ হতে হল তাদের। যিশু সেই সময়ের আচার-ব্যবহার এবং সমাজব্যবস্থা ইত্যাদির সমালোচনা করলেন এবং বিশেষ করে ধনী আর ভণ্ড ধর্মধ্বজী ব্যক্তিদের তীব্র নিন্দা করতে লাগলেন। ইহুদিরা এসব পছন্দ করল না। কোথায় তিনি তাদের সুখসমৃদ্ধি-লাভের পথ দেখাবেন, তার পরিবর্তে কিনা তিনি অনিশ্চিত এবং কাল্পনিক এক স্বর্গ রাজ্য লাভের জন্য সকলকে বললেন সর্বস্ব ত্যাগ করতে। তাঁর বলার ভঙ্গিটি ছিল নূতন; গল্প ও কাহিনীর ছলে তিনি উপদেশ দিতেন। তবে এটা স্পষ্ট বোঝা গেল, তিনি আজন্ম বিপ্লবী। প্রচলিত সমাজব্যবস্থা তিনি বরদাস্ত করতে পারেন নি, তাই তার সংস্কারের জন্যে তিনি উঠে-পড়ে লেগেছিলেন। ইহুদিরা কিন্তু তাঁর কাছ থেকে এটা আশা করে নি। সুতরাং অনেকে তাঁর বিরোধিতা করতে লাগল এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে রোমান গভর্নর পণ্টিয়স পিলেটের হস্তে সমর্পণ করল।
ধর্মের ব্যাপারে রোমানরা ছিল উদার। রাজ্যের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মাচরণে কোনোরূপ বাধানিষেধ ছিল না, এমনকি দেবদেবীর নিন্দা করলে কিংবা তাদের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করলেও কারও শাস্তি হত না। সম্রাট টিবেরাস বলতেন, দেবতারা যদি অপমানিত হয়েই থাকেন তবে তাঁরা নিজেরাই তার প্রতিকার করবেন। এমতাবস্থায় রোমান গভর্নর পণ্টিয়স পিলেট নিশ্চয়ই এই ব্যাপারে ধর্মের প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামান নি। যিশুকে একজন রাজনৈতিক আন্দোলনকারী এবং সমাজদ্রোহীরূপে দাঁড় করানো হল; বিচারে তিনি দোষী সাব্যস্ত হলেন এবং অবশেষে তাঁকে ক্রুশে