বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৯৭

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
যিশুখৃষ্ট ও তাঁহার ধর্ম
৭৯

বিদ্ধ করে হত্যা করা হল। তিনি যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর তখনই তাঁর প্রিয় শিষ্যেরাও বিরুদ্ধবাদীদের ভয়ে পরিত্যাগ করল তাঁকে। ওদের বিশ্বাসঘাতকতা তাঁর ঐ যন্ত্রণাকে যেন আরও দুঃসহ করে তুলল। মৃত্যুর পূর্বে তিনি কাতরস্বরে বলে উঠলেন, “হা ঈশ্বর, হা ঈশ্বর, তুমি কেন আমাকে পরিত্যাগ করলে?”

 যিশুর বয়স তখন অল্প, সবেমাত্র ত্রিশ বৎসর পার হয়েছে; এই সময়েই তাঁর মৃত্যু হল। তাঁর মৃত্যুর কাহিনী পড়লে মনে বড়ো ব্যথা লাগে।

 খৃষ্টীয় ধর্ম প্রচার হবার পর থেকে যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যিশুর প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা দেখিয়েছে, যদিও তাঁর ধর্মোপদেশ তারা পালন করে নি। তবে কিনা তাঁকে যখন ক্রুশে বিদ্ধ করা হয় তখন প্যালেস্টাইনের বাইরে তাঁর নাম বিশেষ প্রচারিত হয় নি। রোমের অধিবাসীরা তো তাঁর সম্বন্ধে কিছুই জানত না এবং পণ্টিয়স পিলেটও এই শোকাবহ ঘটনাকে মোটেই কোনো গুরুত্ব দেন নি।

 বিরুদ্ধবাদীদের ভয়ে যিশুর প্রধান প্রধান শিষ্যেরা তাঁকে ধর্মগুরু বলে মানতে অস্বীকার করেছিল, এ কথা পূর্বে বলেছি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরেই অপর এক ব্যক্তি খৃষ্টীয় মতবাদ প্রচার করতে শুরু করলেন। এঁর নাম পল; ইনি যিশুকে কখনও দেখেন নি। অনেকের ধারণা, পল যে খৃষ্টধর্ম প্রচার করেছিলেন তা বস্তুত যিশুর ধর্মোপদেশ থেকে বিভিন্ন। পল পণ্ডিত লোক, তাঁর ক্ষমতাও ছিল যথেষ্ট; কিন্তু যিশুর ন্যায় তিনি সমাজদ্রোহী ছিলেন না। যা হোক, পলের প্রচেষ্টা সফল হল, খৃষ্টধর্ম ধীরে ধীরে প্রচারলাভ করল। প্রথমে রোমানরা এটা খেয়ালের মধ্যেই আনে নি; মনে করেছিল, খৃষ্টধর্মাবলম্বীরা ইহুদি জাতেরই একটা সম্প্রদায়বিশেষ। কিন্তু ক্রমে দেখা গেল, এরা যেন বিদ্রোহী আর পরমত-অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে এবং সম্রাটের মূর্তি পূজা করতেও অস্বীকার করছে। রোমবাসীরা কিন্তু তাদের এই মনোভাব সম্যক্ বুঝে উঠতে পারল না। মনে করল, এরা সব মাথা পাগলা লোক, অশিক্ষিত আর ঝগড়াটে এবং সবরকম উন্নতির বিরোধী। ধর্মের দিক থেকে তারা খৃষ্টেধর্মকে মেনে নিতে পারত, কিন্তু খৃষ্টানরা যে সম্রাটের মূর্তিকে পূজা করতে অস্বীকার করল! সেটা তাই রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার শামিল বলে রোমানরা মনে করল এবং সেই অপরাধে শাস্তির ব্যবস্থা দিল প্রাণদণ্ড। তার পর শুরু হল অত্যাচার; খৃষ্টানদের ধনসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হল, তাদের নিক্ষেপ করা হল সিংহের মুখে। ঐসকল খৃষ্টান শহিদদের কাহিনী হয়তো তুমি পড়েছ, সিনেমায় এসবের ছবিও দেখে থাকবে-বা। একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে যখন কেউ মরতে প্রস্তুত হয়, আর গৌরব বোধ করে ঐ মরণে, তখন তাকে কিংবা তার উদ্দেশ্যকে দাবিয়ে রাখা অসম্ভব। রোম সাম্রাজ্যও খৃষ্টানদের দাবিয়ে রাখতে পারল না। বস্তুত, এই বিরোধে খৃষ্টানদেরই হল জয়। চতুর্থ শতকের প্রথম ভাগে একজন রোম সম্রাট খৃষ্টের ধর্ম গ্রহণ করলেন এবং তখন থেকে এই ধর্মই সাম্রাজ্যের সরকারি ধর্মরূপে গণ্য হল। এই সম্রাটের নাম কনস্টান্‌টাইন। ইনিই কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ নগরের প্রতিষ্ঠাতা। এঁর কথা পরে বলব।

 খৃষ্টীয় ধর্মের প্রসারলাভের সঙ্গে সঙ্গে যিশুর দেবত্ব নিয়ে শুরু হল ঘোরতর বিরোধ। গৌতমবুদ্ধের বেলায়ও এরকমটা হয়েছিল, সে কথা তোমাকে বলেছি। নিজে কখনও বলেন নি, তিনি দৈবশক্তির অধিকারী, অথচ লোকে তাঁকে দেবতা এবং অবতার-জ্ঞানেই পূজা করে এসেছে। ঠিক সেরকম যিশুও দেবত্ব দাবি করেন নি; পুনঃপুনঃ বলেছেন বটে, তিনি ঈশ্বরের পুত্র, মানুষের সন্তান, কিন্তু এতে করে বোঝায় না যে, তিনি দৈব কিংবা অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন বলে নিজেকে জাহির করেছেন। মানুষ অসামান্য প্রতিভাশালী ব্যক্তিদিগকে দেবতার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতেই ভালোবাসে। কিন্তু আশ্চর্য, দেবত্ব আরোপ করা হলে পর আর তাঁদের বাণী মেনে চলবার প্রয়োজন বোধ করে না। ছয় শো বৎসর পরে হজরত মহম্মদ আর-একটি বড়ো ধর্ম প্রচার করলেন। আগে থাকতেই সাবধান হলেন তিনি; স্পষ্ট করে বললেন, তিনি মানুষ, দেবতা নন।

 কোথায় খৃষ্টানরা যিশুর ধর্মোপদেশ মেনে চলবে, তা না করে তারা ওঁর দেবত্বের স্বরূপ আর ট্রিনিটি বা ত্রিত্বভাব নিয়ে মহা তর্কবিতর্ক জুড়ে দিল, ঝগড়াঝাঁটিও শুরু করল এবং