পাতা:বৌ-ঠাকুরাণীর হাট - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৭২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

১৫৮

বৌ-ঠাকুরাণীর হাট

কুটীরশ্রেণী ছিল—সেই খানেই তাহাদের চারপাই, বাসন, কাপড়চোপড় জিনিষপত্র, সমস্তই থাকে। অগ্নির সংবাদ পাইয়াই যত প্রহরী পারিল সকলেই ছুটিয়া গেল, যাহারা নিতান্তই পারিল না, তাহারা হাত পা আছড়াইতে লাগিল। উদয়াদিত্যের গৃহদ্বারেও দুই একজন প্রহরী ছিল বটে, কিন্তু সেখানে কড়াক্কড় পাহারা দিবার কোন প্রয়োজনই ছিল না। দস্তুর ছিল বলিয়া তাহারা পাহারা দিত মাত্র। কারণ উদয়াদিত্য এমন শান্ত ভাবে তাঁহার গৃহে বসিয়া থাকিতেন যে বোধ হইত না যে তিনি কখন পালাইবার চেষ্টা করিবেন বা তাঁহার পালাইবার ইচ্ছা আছে। এই জন্য তাঁহার দ্বারে প্রহরীরা সর্ব্বাগ্রে ছুটিয়া গিয়াছিল। রাত হইতে লাগিল, আগুন নেবে না—কেহ বা জিনিষ পত্র সরাইতে লাগিল, কেহ বা জল ঢালিতে লাগিল, কেহ বা কিছুই না করিয়া কেবল গোলমাল করিয়াই বেড়াইতে লাগিল; আগুন নিবিলে পর তাহারাই সকলের অপেক্ষা অধিক বাহবা পাইয়াছিল। এইরূপ সকলে ব্যস্ত আছে, এমন সময়ে একজন স্ত্রীলোক তাহাদের মধ্যে ছুটিয়া আসিল, সে কি-একটা বলিতে চায়—কিন্তু তাহার কথা শোনে কে? কেহ তাহাকে গালাগালি দিল, কেহ তাহাকে ঠেলিয়া ফেলিয়া দিল— কেহই তাহার কথা শুনিল না। যে শুনিল সে কহিল, “যুবরাজ পালাইলেন তাতে আমার কি মাগি, তোরই বা কি? সে দয়াল সিং জানে—আমার ঘর ফেলিয়া এখন আমি কোথাও যাইতে পারি না।”

 বলিয়া সে ভিড়ের মধ্যে মিশিয়া গেল। এইরূপ বারবার প্রতিহত হইয়া সেই রমণী অতি প্রচণ্ডা হইয়া উঠিল। একজন যাহাকে সমুখে পাইল তাহাকেই সবলে ধরিয়া কহিল—“পোড়ারমুখো, তোমরা কি চোখের মাথা খাইয়াছ? রাজার চাকরী কর সে জ্ঞান কি নাই? কাল রাজাকে বলিয়া হেঁটোয় কাঁটা উপরে কাঁটা দিয়া তোমাদের মাটিতে পুঁতিব তবে ছাড়িব। যুবরাজ যে পালাইয়া গেল!”