পাতা:বৌ-ঠাকুরাণীর হাট - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২০১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

বৌ-ঠাকুরাণীর হাট

১৮৭

অবসর বুঝিয়া মুক্তিয়ার খাঁ ব্যথিত হৃদয়ে যুবরাজের নিকট আসিয়া বসিল, বিনীত ভাবে জিজ্ঞাসা করিল—“যুবরাজ, কি ভাবিতেছেন?” যুবরাজ চমকিয়া উঠিলেন—অনেকক্ষণ স্তব্ধভাবে অবাক হইয়া মুক্তিয়ারের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। মুক্তিয়ারের মুখে মমতার ভাব দেখিয়া সহসা রুদ্ধপ্রাণ খুলিয়া যুবরাজ বলিয়া উঠিলেন—“ভাবিতেছি, পৃথিবীতে জন্মাইয়া আমি কি করিলাম। আমার জন্য কি সর্ব্বনাশই হইল! হে বিধাতা, যাহারা দুর্ব্বল এ পৃথিবীতে তাহারা কেন জন্মায়? যাহারা নিজের বলে সংসারে দাঁড়াইতে পারে না—যাহারা পদে পদে পরকে জড়াইয়া ধরে— তাহাদের দ্বারা পৃথিবীর কি উপকার হয়? তাহারা যাহাকে ধরে, তাহাকেই ডুবায়, পৃথিবীর সকল কাজেই বাধা দেয়—নিজেও দাঁড়াইতে পারে না, আর সকলকেও ভারাক্রান্ত করে।—আমি একজন দুর্ব্বল ভীরু, ঈশ্বর আমাকেই বাঁচাইলেন, আর যাহারা সংসারের আনন্দ ছিল, সংসারের ভরসা ছিল—আমার জন্য তাহাদেরই বিনাশ করিলেন? আর না, এ সংসার হইতে আমি বিদায় হইলাম।”

 উদয়াদিত্য বন্দীভাবে প্রতাপাদিত্যের সম্মুখে আনীত হইলেন। প্রতাপাদিত্য তাঁহাকে অন্তঃপুরের কক্ষে লইয়া গিয়া দ্বার রুদ্ধ করিলেন। প্রতাপাদিত্যের কাছে আসিতেই উদয়াদিত্যের শরীর যেন শিহরিয়া উঠিল, অনিবার্য্য ঘৃণায় তাঁহার সর্ব্বশরীরের মাংস যেন কুঞ্চিত হইয়া আসিল —তিনি পিতার মুখের দিকে আর চাহিতে পারিলেন না!

 প্রতাপাদিত্য গম্ভীর স্বরে কহিলেন—“কোন্ শাস্তি তােমার উপযুক্ত?”

 উদয়াদিত্য অবিচলিত ভাবে কহিলেন, “আপনি যাহা আদেশ করেন।”

 প্রতাপাদিত্য কহিলেন—“তুমি আমার এ রাজ্যের যােগ্য নহ।”

 উদয়াদিত্য কহিলেন—“না মহারাজ, আমি যােগ্য নহি। আমি