পাতা:বৌ-ঠাকুরাণীর হাট - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৩০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

১৬

বৌ-ঠাকুরাণীর হাট

 প্রতাপ—“কে? তােমাদের যুবরাজ উদয়াদিত্য না কি?”

 মন্ত্রী—“আজ্ঞা, মহারাজ, এমন কথা বলিবেন না। কে করিয়াছে। সন্ধান পাই নাই।”

 প্রতাপ—“যেই করুক, তাহার জন্য অধিক ভাবিও না, আমিই দিল্লীশ্বরের বিচারকর্ত্তা, আমিই তাহার দণ্ডের উদ্যোগ করিতেছি। সে পাঠানেরা এখনও ফিরিল না? উদয়াদিত্য এখনো আসিল না? শীঘ্র প্রহরীকে ডাক।”


তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

 বিজন পথ দিয়া বিদ্যুদ্বেগে যুবরাজ অশ্ব ছুটাইয়া চলিয়াছেন। অন্ধকার রাত্রি, কিন্তু পথ দীর্ঘ সরল প্রশস্ত বলিয়া কোন ভয়ের আশঙ্কা নাই। স্তব্ধ রাত্রে অশ্বের খুরের শব্দে চারিদিক প্রতিধ্বনিত হইতেছে, দুই একটি কুকুর ঘেউ-ঘেউ করিয়া ডাকিয়া উঠিতেছে, দুই একটা শৃগাল চকিত হইয়া পথ ছাড়িয়া বাঁশঝাড়ের মধ্যে লুকাইতেছে। আলােকের মধ্যে আকাশে তারা ও পথপ্রান্তস্থিত গাছে জোনাকি; শব্দের মধ্যে ঝিঁ ঝিঁ পােকার অবিশ্রাম শব্দ; মনুষ্যের মধ্যে কঙ্কাল-অবশেষ একটি ভিখারী বৃদ্ধা গাছের তলায় ঘুমাইয়া আছে! পাঁচ ক্রোশ পথ অতিক্রম করিয়া, যুবরাজ পথ ছাড়িয়া একটা মাঠে নামিলেন। অশ্বের বেগ অপেক্ষাকৃত সংযম করিতে হইল! দিনের বেলায় বৃষ্টি হইয়াছিল, মাটি ভিজা ছিল, পদে পদে অশ্বের পা বসিয়া যাইতেছে। যাইতে যাইতে সম্মুখের পায়ে ভর দিয়া অশ্ব তিনবার পড়িয়া গেল। শ্রান্ত অশ্বের নাসারন্ধ্র বিস্ফারিত, মুখে ফেন, পশ্চাতের পদদ্বয়ের ঘর্ষণে ফেন জন্মিয়াছে, পঞ্জরের ভিতর হইতে একটা শব্দ বাহির হইতেছে, সর্ব্বাঙ্গ ঘর্ম্মে প্লাবিত। এদিকে দারুণ গ্রীষ্ম, বাতাসের লেশ মাত্র নাই, এখনাে অনেকটা পথ অবশিষ্ট রহিয়াছে। বহুতর জলা ও চষা মাঠ অতিক্রম করিয়া যুবরাজ অবশেষে