পাতা:বৌ-ঠাকুরাণীর হাট - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৬৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

৫৪

বৌ-ঠাকুরাণীর হাট

ডাকিলে আমি যাব না; দেখি, কত দিনে তাঁর মনে পড়ে! তা’ কৈ, একবারাে ত মনে পড়িল না!”

 বিভা ভারি মুষ্কিলে পড়িল। সে কেন ডাকে নাই, তাহা ভাল করিয়া বলিতে পারিল না। তাহা ছাড়া, ডাকে নাই বলিয়া যে মনে করে নাই, এই কথাটার মধ্যে এক জায়গায় কোথায় যুক্তির দোষ আছে বলিয়া মনে হইতেছে, অথচ ভাল করিয়া বুঝাইয়া বলিতে পারিতেছে না।

 বিভার মুষ্কিল দেখিয়া রামমােহন হাসিয়া কহিল, “না মা অবসর পাই নাই বলিয়া আসিতে পারি নাই।”

 বিভা কহিল, “মােহন তুই বােস; তােদের দেশের গল্প আমায় বল্।”

 রামমােহন বসিল। চন্দ্রদ্বীপের বর্ণনা করিতে লাগিল। বিভা গালে হাত দিয়া এক মনে শুনিতে লাগিল। চন্দ্রদ্বীপের বর্ণনা শুনিতে শুনিতে তাহার হৃদয়টুকুর মধ্যে কত কি কল্পনা জাগিয়া উঠিয়াছিল, সে দিন সে আসমানের উপর কত ঘর বাড়িই বাঁধিয়াছিল, তাহার আর ঠিকানা নাই। যখন রামমােহন গল্প করিল, গত বর্ষার বন্যায় তাহার ঘড় বাড়ি সমস্ত ভাসিয়া গিয়াছিল; সন্ধ্যার প্রাক্কালে সে একাকী তাহার বৃদ্ধা মাতাকে পিঠে করিয়া সাঁতার দিয়া মন্দিরের চূড়ায় উঠিয়াছিল, ও দুই জনে মিলিয়া সমস্ত রাত্রি সেইখানে যাপন করিয়াছিল;—তখন বিভার ক্ষুদ্র বুকটির মধ্যে কি হৃৎকম্পই উপস্থিত হইয়াছিল।

 গল্প ফুরাইলে পর রামমােহন কহিল “মা, তোমার জন্য চারগাছি শাঁখা আনিয়াছি, তােমাকে ঐ হাতে পরিতে হইবে, আমি দেখিব।”

 বিভা তাহার চারগাছি সােনার চুড়ি খুলিয়া শাঁখা পরিল, ও হাসিতে হাসিতে মায়ের কাছে গিয়া কহিল,—“মা, মােহন তােমার চুড়ি খুলিয়া আমাকে চারগাছি শাঁখা পরাইয়া দিয়াছে।”

 মহিষী কিছুমাত্র অসন্তুষ্ট না হইয়া হাসিয়া কহিলেন, “তা,’ বেশ ত সাজিয়াছে, বেশ ত মানাইয়াছে।”