পাতা:বৌ-ঠাকুরাণীর হাট - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৭২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

৫৮

বৌ-ঠাকুরাণীর হাট

কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধভাবে থাকিয়া কহিলেন—“লছমন্ শুন, কাল প্রভাতে যখন রামচন্দ্র রায় অন্তঃপুর হইতে বাহির হইবে, তখন তাহাকে বধ করিবে, তােমার উপর আদেশ রহিল।” শ্যালক দেখিলেন তিনি যত দূর মনে করিয়াছিলেন, তাহা অপেক্ষা অনেক অধিক হইয়া গিয়াছে। তিনি সেই রাত্রে চুপি চুপি আসিয়া বিভার শয়নকক্ষের দ্বারে আঘাত করিলেন।

 তখন দূর হইতে দুই প্রহরের নহবৎ বাজিতেছে। নিঃস্তব্ধ রাত্রে সেই নহবতের শব্দ, জ্যোৎস্নার সহিত, দক্ষিণা-বাতাসের সহিত মিশিয়া ঘুমন্ত প্রাণের মধ্যে স্বপ্নসৃষ্টি করিতেছে। বিভার শয়নকক্ষের মুক্ত বাতায়ন ভেদ করিয়া জ্যোৎস্নার আলাে বিছানায় আসিয়া পড়িয়াছে, রামচন্দ্র রায় নিদ্রায় মগ্ন। বিভা উঠিয়া বসিয়া চুপ করিয়া গালে হাত দিয়া ভাবিতেছে। জ্যোৎস্নার দিকে চাহিয়া তাহার চোখ দিয়া দুই এক বিন্দু অশ্রু ঝরিয়া পড়িতেছিল। বুঝি যেমনটি কল্পনা করিয়াছিল ঠিক তেমনটি হয় নাই। তাহার প্রাণের মধ্যে কাঁদিতেছিল। এতদিন যাহার জন্য অপেক্ষা করিয়াছিল, সে দিন ত আজ আসিয়াছে।

 রামচন্দ্র রায় শয্যায় শয়ন করিয়া অবধি বিভার সহিত একটি কথা কন নাই। প্রতাপাদিত্য, তাঁহাকে অপমান করিয়াছে—তিনি প্রতাপ-আদিত্যকে অপমান করিবেন কি করিয়া? না, বিভাকে অগ্রাহ্য করিয়া। তিনি জানাইতে চান, “তুমি ত যশােহরের প্রতাপাদিত্যের মেয়ে, চন্দ্রদ্বীপাধিপতি রাজা রামচন্দ্র রায়ের পাশে কি তােমাকে সাজে?” এই স্থির করিয়া সেই যে পাশ ফিরিয়া শুইয়াছেন আর পাশ্বপরিবর্ত্তন করেন নাই। যত মান অভিমান সমস্তই বিভার প্রতি। বিভা জাগিয়া বসিয়া ভাবিতেছে। একবার জ্যোৎস্নার দিকে চাহিতেছে, একবার স্বামীর মুখের দিকে চাহিতেছে। তাহার বুক কাঁপিয়া কাঁপিয়া এক একবার দীর্ঘনিশ্বাস উঠিতেছে—প্রাণের মধ্যে বড় ব্যথা বাজিয়াছে। সহসা