বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - তৃতীয় খণ্ড.pdf/১৩০

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
গাজর
গাঁজা

সমাজ এই অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করিয়াছিল। গ্রাম্য শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করিয়া এই উৎসবের অনুষ্ঠান হয়। কোনও কোনও গ্রামবাসী পূর্ব হইতে মানসিক করিয়া ইহাতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করিয়া থাকে, তাহাদিগকে সন্ন্যাসী বা ভক্ত্যা বলে। সন্ন্যাসীরা হবিষ্যান্ন ভোজন করে, উত্তুরী (উত্তরীয়) ও একখণ্ড বেত্র ধারণ করে। তাহার ফলেই দেবকর্মে তাহাদের অধিকার জন্মায়। সন্ন্যাসীরা শিবমন্দিরের প্রাঙ্গণে নানা প্রকার কৃচ্ছ্রসাধন দ্বারা দেবতার মনস্তুষ্টি সম্পাদন করিবার প্রয়াস পায়। এই সব কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে জিহ্বা ফোঁড়া, কাঁটা ঝাঁপ, আগুনের উপর দিয়া হাঁটিয়া যাওয়া, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। চড়ক গাজন অনুষ্ঠানের একটি অঙ্গ। এই উপলক্ষে এক শোভাযাত্রা বাহির করিয়া গ্রামান্তরের শিবতলায় লইয়া যাওয়া হয়, একজন শিব ও একজন গৌরী সাজিয়া নৃত্য করে, অন্যান্য সন্ন্যাসী নন্দী, ভৃঙ্গী, ভূতপ্রেত দৈত্যদানব প্রভৃতি সাজিয়া নৃত্য করিয়া থাকে। শিবের সম্পর্কে নানা লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়, তাহাতে শিবের নিদ্রাভঙ্গ হইতে আরম্ভ করিয়া তাঁহার কৃষিকর্ম পর্যন্ত নানা বিষয়ের উল্লেখ থাকে। এই অনুষ্ঠান সাধারণতঃ তিন দিন ব্যাপী চলিয়া থাকে।

 পূর্ব বাংলায় চৈত্রসংক্রান্তির গাজন উপলক্ষে কালীকাচ একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। অসুরবধ উপলক্ষে কালীর নৃত্য ইহার বিষয়। বাংলার লোকনৃত্যের ইহা একটি বিশিষ্ট নিদর্শন। ‘চড়ক’ দ্র।

দ্র আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলার লোক-শ্রুতি, কলিকাতা, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ, আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, কলিকাতা, ১৩৭১ বঙ্গাব্দ।

আশুতোষ ভট্টাচার্য

গাজর ধন্যাক গোত্রের (ফ্যামিলি-উম্‌বেল্লিফেরী, Family-Umbelliferae) অন্তর্গত দ্বিবীজপত্রী বীরুৎ; বিজ্ঞানসম্মত নাম দাউকস কারোতা (Daucus carota)। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে ধনে, মৌরি, জিরা জোয়ান প্রভৃতি মশলার গাছও ঐ একই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।

 আফগানিস্তান ও তৎসন্নিহিত অঞ্চল গাজরের জন্মভূমি। বর্তমানে পৃথিবীর বহু নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে ইহার চাষ হয়। ভারতবর্ষে শীতকালীন সবজি হিসাবে গাজর উৎপন্ন হয়। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে গাজর বর্ষজীবী গাছ, কিন্তু শীতপ্রধান দেশে ইহা দ্বিবর্ষজীবী। বেলে ও দো-আঁশ-মাটিতে গাজর ভাল হয়। হেক্টর প্রতি ফলন প্রায় ১৮ হইতে ৪৫ মেট্রিক টন।

 গাজরের যৌগ (কম্পাউণ্ড) পত্রগুলি ভূমিসংলগ্ন ক্ষুদ্র কাণ্ড হইতে বাহির হয়। দীর্ঘ পুষ্পদণ্ডের প্রান্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাদা বা গোলাপি ফুল ফোটে। পুষ্পবিন্যাস যৌগ ছত্রবিন্যাস জাতীয়। ফল ক্ষুদ্র ও শ্বেতবর্ণ।

 মাটির নীচে গাজরের প্রধান মূলে প্রচুর খাত সঞ্চিত থাকায় মূলটি স্ফীত ও শাঙ্কব (কোনিক্যাল) হইয়া ওঠে। জল, কার্বোহাইড্রেট, খনিজ লবণ প্রভৃতি ছাড়া এই মূলে যথেষ্ট পরিমাণে ক্যারোটিন নামক পীতবর্ণ রাসায়নিক পদার্থ থাকায় মূলটির বর্ণ হলুদ বা কমলা। এই ক্যারোটিন হইতে প্রাণীদেহে ভিটামিন এ উৎপন্ন হইতে পারে, তাই গাজরের মূল সবজি হিসাবে উৎকৃষ্ট।

দ্র Council of Scientific & Industrial Research, The Wealth of India: Raw Materials, vol. III, New Delhi, 1952.

সুনীলকুমার ভট্টাচার্য

গাঁজা সিদ্ধি গাছের ফুল হইতে উৎপন্ন মাদকদ্রব্য। সিদ্ধি গাছ (কান্নাবিস সাতিভা, Cannabis sativa) মোরাসিঈ বা তুঁত গোত্রের (Family-Moraceae) অন্তর্ভুক্ত দ্বিবীজপত্রী, বর্ষজীবী, বীরুৎজাতীয় উদ্ভিদ। আসাম, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিম বঙ্গ, বিহার, মধ্য প্রদেশ, মাদ্রাজ প্রভৃতি রাজ্যে এই গাছের চাষ আছে। কার্তিক মাসে বীজ বপন করিলে তিন-চারি মাস পরে ফুল ফোটে। গাছ ১-৫ মিটার উঁচু হয়, কাণ্ড সরল। সরু পাতার উভয় প্রান্ত করাতের দাঁতের মত এবং অগ্রভাগ হুচালো। ফুল ঈষৎ সবুজাভ শাদা। গাছের স্ত্রী-পুরুষ ভেদ আছে।

 সিদ্ধি গাছের কাণ্ড হইতে একপ্রকার সেলুলোজ প্রধান তন্তু উৎপন্ন হয়; ইহা হইতে নৌকার পাল, ত্রিপল প্রভৃতি তৈয়ারি হয়। ভারতের গাঢ়ওয়াল, আলমোড়া, নৈনিতাল প্রভৃতি অঞ্চলে এই তন্তুর জন্য সিদ্ধি গাছের চাষ হয়। সিদ্ধি গাছের বীজের তৈল সাবান, রঙ প্রভৃতি শিল্পে ব্যবহৃত হয়। সিদ্ধি গাছের পাতা শুকাইয়া সিদ্ধি বা ভাঙ, আঠা হইতে চরস ও স্ত্রী গাছের ফুল হইতে গাঁজা উৎপন্ন হয়। এই তিনটি মাদক দ্রব্যের মধ্যে সিদ্ধির মাদকতাই সর্বাপেক্ষা কম।

 ভারতে আহ্‌মদনগর অঞ্চলের গাঁজাই সর্বোৎকৃষ্ট বলিয়া বিবেচিত হয়। গাঁজার জন্য চাষের সময় খেত হইতে সকল পুং-গাছ কাটিয়া ফেলা হয়। স্ত্রী-গাছের ফুলের বোঁটায় হলুদ রঙ ধরিতে আরম্ভ করিলেই ফুলগুলি কাটিয়া লইয়া মাড়াই, শুকানো, চাপ দেওয়া ইত্যাদি পদ্ধতির সাহায্যে গাঁজা প্রস্তুত করা হয়। গড়ে প্রতি হেক্টর জমিতে প্রায় ২৮০ কিলোগ্রাম গাঁজা উৎপন্ন হয়।

১০১