বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - তৃতীয় খণ্ড.pdf/৩৩১

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
চলচ্চিত্র
চলচ্চিত্র

গৌড়ী, দেশাখ, রামক্রী, শবরী, অরুদেবক্রী, ধানশ্রী, মালশ্রী এবং বঙ্গাল—এই রাগগুলির উল্লেখ পাওয়া যায়। চর্যাগীতির সহিত মণ্ডি-ডক্কা (মড্ডু বা মোড়া) নামক তন্ত্রীযুক্ত চর্মবাদ্য বাজানো হইত। হরিপাল (ত্রয়োদশ শতক) জানাইয়াছেন যে চর্যা বহু প্রকারের হইত এবং ইহা যোগীরা গাহিতেন—‘যোগিভির্গীয়তে চর্যা প্রকারৈর্বহুভিত্ত্বসৌ’।

দ্র শার্ঙ্গদেব, সংগীত রত্নাকর, ঐ টীকা, কল্লিনাথ, সিংহভূপাল; রামকৃষ্ণ কবি-সম্পাদিত, ভরতকোষ, তিরুপতি, ১৯৫১।

রাজ্যেশ্বর মিত্র

চলচ্চিত্র বিখ্যাত ইংরেজী শব্দকোষ থেসরাস্-এর সংকলক পিটার মার্ক রজেট ১৮২৪ খ্রীষ্টাব্দে এক অভিনব সূত্র আবিষ্কার করেন: মানুষ যে কোনও দৃশ্যই দেখুক, তাহা অপসৃত হইবামাত্র চক্ষু হইতে বিলীন হয় না। এই মূলসূত্রের উপর ভিত্তি করিয়া চলচ্চিত্রের আবিষ্কার ও নির্মাণ সম্ভবপর হইয়াছে।

 পৃথক পৃথক আলোকচিত্র পরপর অল্প দূরত্বে সাজাইয়া দ্রুতগতিতে চক্ষুর সম্মুখে উপস্থিত করিলে রজেট-এর উক্ত সূত্র অনুযায়ী দৃশ্যটি চলমান বলিয়া ভ্রম হয়। স্বচ্ছ সেলুলয়েডের ফিতার উপর ছাপা আলোকচিত্র প্রজেক্টর বা প্রক্ষেপণ যন্ত্রের দ্বারা বৃহদাকারে পর্দার উপর ক্ষেপণ করিলে আরও নিখুঁতভাবে ঐ গতিশীলতার বোধ সৃষ্টি করা সম্ভবপর।

 চলচ্চিত্র-গ্রহণ ও প্রদর্শনের কৌশল যে কে উদ্ভাবন করেন তাহা লইয়া মতভেদ আছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ব্যক্তি মোটামুটি একই সময়ে এই বিষয়ে গবেষণার রত ছিলেন। ইহাদের মধ্যে ফরাসী দেশের এতিয়েন্‌-ঝুল্‌ মারে, ইংল্যাণ্ডের এড্‌ওয়ার্ড মাইব্রিজ এবং আমেরিকার টমাস্ এডিসন-এর গবেষণাগারে নিযুক্ত ইংরেজ গবেষক ডিক্‌সন-এর নাম উল্লেখযোগ্য। ইহা বলা যাইতে পারে যে চলচ্চিত্র বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন আবিষ্কারের সমষ্টি―কোনও একজন আবিষ্কর্তার একক উদ্ভাবন নহে। সম্ভবতঃ ইংল্যাণ্ডে ফ্রীজগ্রীন ও ফরাসী দেশে রেনো (Raynaud) একই সময়ে ছবির ফিতার দুই পার্শ্বে ছিদ্রস্থাপনের দ্বারা দুই চিত্রের মধ্যবর্তী ব্যবধানকে স্থিরীকৃত করিতে সক্ষম হন। ইহার ফলে দর্শকের চোখে গতির ছন্দ দ্রুত বা মন্থর না হইয়া স্বাভাবিকভাবে প্রতিভাত হয়। এডিসন-এর পরীক্ষাগারে ডিক্‌সন সেলুলয়েডের উপরে চলচ্চিত্রের ছবিগুলিকে ছাপার ও উপর হইতে নীচের দিকে চালিত করিবার কৌশল আবিষ্কার করেন।

 বিভিন্ন আবিষ্কারকের শ্রেষ্ঠ বিশেষত্বগুলিকে একত্রিত করিয়া পর্দার উপরে চিত্রপ্রক্ষেপণের কৌশল সর্বপ্রথম আয়ত্ত করেন ফরাসী দেশের লুমিয়ের ভ্রাতৃবৃন্দ। ইহাদেরই চেষ্টায় বোম্বাই নগরীতে অবস্থিত তৎকালীন ওয়াট্‌সন্‌স হোটেলে ১৮৯৬ খ্রীষ্টাব্দে ভারতে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। পৃথিবীর নানা দেশে ঐ সময় হইতে চলচ্চিত্রপ্রদর্শন প্রবর্তিত হয়। সেকালের চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য ছিল অতি অল্প এবং বিষয় ছিল সহজ। ট্রেন চলিতেছে, তীরের উপর ঢেউ আছড়াইয়া পড়িতেছে, এজাতীয় দৃশ্যই চলচ্চিত্রের প্রথম দর্শকবৃন্দকে মুগ্ধ করিয়াছিল। নিউজ রীল বা সংবাদচিত্র এই যুগেই প্রথম নির্মিত হয়।

 ১৮৯৬ খ্রীষ্টাব্দে ফরাসী দেশের ঝ়র্ঝ় মেলি (Georges Melies) নামে জাদুকর চলচ্চিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া আকস্মিকভাবে চলচ্চিত্রের জাদুকরী সম্ভাবনা আবিষ্কার করেন। তাঁহার উদ্ভাবিত নানাবিধ কৌশল এখনও চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়; যেমন, একব্যক্তিকে দুই বেশে একই চিত্রের মধ্যে উপস্থিত করা প্রভৃতি; কিন্তু মেলি চলচ্চিত্রের জাদুবিদ্যার মধ্যেই আবদ্ধ রহিলেন না, অল্পদিনের মধ্যেই তিনি চিত্রনাট্যের রীতিতে পরিকল্পিত চলচ্চিত্রগ্রহণে ব্রতী হন। এই রীতির ফলে তাঁহার সৃষ্ট সিন্‌ডরেলা ও অন্যান্য ছবি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। উহার দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া ১৯০২ খ্রীষ্টাব্দে ‘দি লাইফ অফ অ্যান অ্যামেরিকান ফায়ার-ম্যান’ নামক চলচ্চিত্রে আমেরিকাবাসী এড্‌উইন পোর্টার মেলি-র রীতিকে আরও প্রসারিত করিয়া বর্তমান কালের ঘটনাবর্ণনারীতির ভিত্তি স্থাপনা করেন। পোর্টারের প্রধান অবদান হইল সম্পাদনা বা এডিটিং। ইহা বর্তমান চলচ্চিত্ররীতির অন্যতম আবশ্যিক উপাদান। তিনি পূর্বোল্লিখিত চিত্রে ক্লোজ-আপ বা নিকটদৃষ্টিরও অবতারণা করেন। সম্পাদনা এবং প্রয়োজন অনুসারে ক্যামেরার দূরত্ব পরিবর্তনের সাহায্যে আধুনিক চলচ্চিত্রের মূলভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হইল।

 ১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দে ডেভিড্ ওয়ার্ক গ্রিফিথ-এর আবির্ভাবের ফলে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নবযুগের সূচনা হয়। সিনেমাকে মঞ্চরীতি হইতে মুক্ত করিয়া এবং ক্যামেরার দৃষ্টিকোণের বিভিন্নতা—নিকটদৃষ্টি ও দূরদৃষ্টির (লং শট) উপযুক্ত ব্যবহার—দৃশ্য বস্তুর সুক্ষ্ম বিশ্লেষণ, আলোকসম্পাতের নাটকীয় বৈচিত্র্য ইত্যাদি কলাকৌশলের সুনিপুণ প্রয়োগের দ্বারা তিনি চলচ্চিত্রকে এক নূতন ‘ভাষা’ ও ‘শিল্পের’ মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করিলেন। ‘বার্থ অফ এ নেশন’, ‘ইন্‌টলারেন্স’ প্রভৃতি ছবি তাঁহার শিল্পনৈপুণ্যের

৩০২