বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - তৃতীয় খণ্ড.pdf/৩৩২

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
চলচ্চিত্র
চলচ্চিত্র

দৃষ্টান্ত। চলচ্চিত্রের এই ভাষা চার্লি চ্যাপ্‌লিন-এর হাস্যরসোচ্ছল অথচ অর্থময় চলচ্চিত্রে নব রূপ পরিগ্রহ করিল। চ্যাপ্‌লিনের ‘দি গোল্ড রাশ্‌’ (১৯২৫ খ্রী) এক অনবদ্য সৃষ্টি। ঐ বৎসরেই রুশ দেশের যশস্বী আইজ়ন্‌স্টাইন ‘ব্যাটেল্‌শিপ, পোটেম্‌কিন’-এ চলচ্চিত্রের সম্পাদনরীতিকে বিমূর্ত ভাব ও অর্থদ্যোতনার উদ্দেশ্যে অপূর্বরূপে নিয়োগ করিলেন। ১৯২৯ খ্রীষ্টাব্দে ডেন্‌মার্কবাসী কার্ল ড্রাইয়র ‘দি প্যাশন অফ জোয়ান অফ আর্ক’ ছবিতে নির্বাক যুগের চলচ্চিত্রশিল্পের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিলেন।

 নির্বাক যুগে উপরি-উক্ত বিকাশের পরে ১৯২৯-৩০ খ্রীষ্টাব্দে সবাক চলচ্চিত্রের আবির্ভাব হইল। তাহার অল্পকাল পরেই বহুবর্ণ চলচ্চিত্র আত্মপ্রকাশ করে এবং একবর্ণ ও বহুবর্ণ উভয়বিধ চলচ্চিত্রেই আঙ্গিকগত উন্নতির ফলে উহার বাস্তব রূপায়ণক্ষমতা বিশেষভাবে পরিপুষ্ট হইল। দ্বিতীয় যুদ্ধোত্তর কালে পাশ্চাত্ত্য দেশসমূহে গৃহে গৃহে টেলিভিজ়ন যন্ত্রের প্রচলনের পরে চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা রক্ষার উদ্দেশ্যে বৃহদায়তন প্রেক্ষাপটের ব্যবহার বাড়িয়াছে। থ্রি ডাইমেনশন্যাল অথবা স্টেরিওস্কোপিক চলচ্চিত্রও দেখা দেয়, যদিও আজ পর্যন্ত ইহার বিশেষ প্রসার ঘটে নাই। বৃহদায়তন প্রেক্ষাগৃহে ব্যবহারের জন্য চলচ্চিত্র সাধারণতঃ ৩৫ মিলিমিটার চওড়া ফিতায় ছাপা হয়, কিন্তু অল্পসংখ্যক দর্শকের মধ্যে দেখানোর জন্য ১৬ মিলিমিটারে ছাপা চলচ্চিত্র আজকাল সর্বত্র নির্মিত হইতেছে। ঘরোয়াভাবে ব্যবহারের জন্য ৮ মিলিমিটারের চলচ্চিত্র অনেকেই ব্যবহার করিয়া থাকেন, তবে ইহাতে এখনও পর্যন্ত ধ্বনিসংযোগ করিবার উৎকৃষ্ট উপায় উদ্ভাবিত হয় নাই। নূতন নূতন টেকনিক-এর আবিষ্কার ও প্রয়োগের ফলে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্র অধুনা বহু বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছে এবং ইহা একটি সম্পূর্ণ নূতন ভাষার স্থান গ্রহণ করিয়াছে। এ ভাষাতে গদ্য, কাব্য, সংবাদ-সাহিত্য, বিজ্ঞান-সাহিত্য, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস ইত্যাদি নানাজাতীয় রচনা সম্ভব। আধুনিক কালের প্রামাণ্য-চিত্র বা দলিল-চিত্র (ডক্যুমেণ্টরি ফিল্ম), সংবাদ-চিত্র (নিউজ রীল), কাহিনী-চিত্র (ফিচর ফিল্ম), শিক্ষামূলক চিত্র (এডুকেশনাল ফিল্ম), বিজ্ঞাপন-চিত্র, সঞ্চালিত-চিত্র (অ্যানিমেটেড ফিল্ম, যাহাতে সম্পূর্ণরূপে অঙ্কিত চিত্রের ভিত্তিতে চলচ্চিত্র প্রস্তুত হয়), পুতুল-চিত্র (পাপেট ফিল্ম) ইত্যাদির প্রসার দেখিলে তাহা হৃদয়ংগম করা যায়। কাহিনী-চিত্রের মধ্যেও বহু প্রকারভেদ আছে।

 চলচ্চিত্র-নির্মাণ অন্যান্য শিল্পকলার অনুপাতে অতিশয় ব্যয়সাপেক্ষ এবং তাহাতে বহুজনের সংঘবদ্ধ শ্রমের প্রয়োজন ঘটে। এই কারণে এবং রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের সাহায্যে
নির্মিত জটিল যন্ত্রপাতিকে আশ্রয় করার ফলে চলচ্চিত্র শ্রমশিল্প ও শিল্পকলার দ্বৈত চরিত্র পরিগ্রহণ করিয়াছে। তদুপরি, চলচ্চিত্রের প্রমোদবিতরণ ক্ষমতা অতি ব্যাপক; বিশাল দর্শক-সম্প্রদায়ের নিকট হইতে প্রভূত পরিমাণে অর্থ সংগৃহীত হইতে পারে। আমেরিকান চলচ্চিত্র ‘গন উইথ দ্য উইণ্ড’ হইতে সাড়ে চার কোটি টাকা আয় হইয়াছিল।

 নির্মাণ, পরিবেশন ও প্রদর্শন এই তিনটি প্রধান বিভাগে চলচ্চিত্রশিল্প বিভক্ত। নির্মাণ বিভাগের প্রথম সোপান অর্থবিনিয়োগের ব্যবস্থাপনা। ইহাতে প্রযোজকের ভূমিকাই প্রধান, তৎপরে পরিচালক। প্রযোজকের দ্বারা নির্ধারিত অর্থ ও উদ্দেশ্য-গত সীমানার মধ্যে রাখিয়া চলচ্চিত্রটি সর্বাঙ্গসুন্দরভাবে রূপায়িত করা পরিচালকের কর্তব্য। বিশেষ খ্যাতিমান ও প্রভাবশালী পরিচালকেরা প্রায়শঃ প্রযোজকের ভূমিকাও অনেকাংশে নিজেরাই গ্রহণ করেন, অথবা সাধারণতঃ যাহা প্রযোজকের সিদ্ধান্তের এলাকা বলিয়া সাব্যস্ত হয় তাহার মধ্যে নিজেদের প্রভাব কাহিনী অথবা নটনটী নির্বাচনের মত ক্ষেত্রেও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। পরিচালকের নির্দেশে ও তাঁহার উদ্দেশ্য অনুযায়ী চলচ্চিত্র-নির্মাণের বিভিন্ন বিভাগের ভার বিভিন্ন আঙ্গিক-কুশলীর উপর ন্যস্ত হয়; যেমন চিত্রনাট্য-রচনা (ক্ষেত্রবিশেষে পরিচালক নিজেই এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন), চিত্রগ্রহণ, শব্দগ্রহণ, শব্দপুনর্যোজন, পরিস্ফুটন, আবহসংগীত রচনা ইত্যাদি। বিভিন্ন বিভাগের কর্তার অধীনে তাঁহার সহকারীবর্গের স্থান। সুতরাং ক্ষেত্রবিশেষে একটি চলচ্চিত্রের নির্মাণকার্যে নিযুক্ত কর্মীসংখ্যা—বিশেষতঃ যেখানে অধিক-সংখ্যক পাত্রপাত্রী ও চিত্রস্থ স্থান-কালের নানা ভেদাভেদ—যন্ত্রশিল্পের কোনও কারখানার সমান হওয়া বিচিত্র নহে। ফলতঃ পরিচালকের শিল্পীভূমিকার গুরুত্ব যেরূপ, নেতৃভূমিকার গুরুত্ব তদপেক্ষা ন্যূন নহে। পরিচালক যত মহৎ শিল্পীই হউন না কেন, তাঁহার ম্যানেজার-ভূমিকা তিনি কখনই সম্পূর্ণ বর্জন করিতে পারেন না।

 চলচ্চিত্র নির্মাণের অপরাংশ, অর্থাৎ পরিবেশন ও প্রদর্শন, সম্পূর্ণভাবে ব্যাবসায়িক কর্ম। প্রযোজকের নিকট হইতে নির্মিত চলচ্চিত্রটির ভার লইয়া পরিবেশক বিভিন্ন স্থানে তাহা দেখানোর ব্যবস্থা করেন। প্রদর্শক, অর্থাৎ প্রেক্ষাগৃহের মালিক, পরিবেশকের সহিত চুক্তিবদ্ধ হইয়া চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন। অধিকাংশ দেশে প্রদর্শনের পূর্বে চলচ্চিত্র অনুমোদনের জন্য স্থাপিত বিশেষ একটি সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার অনুমতি গ্রহণ আবশ্যক হয়। প্রয়োজনবোধে এই সংস্থা জনকল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া কোনও চলচ্চিত্রের প্রদর্শন আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ
৩০৩