শেষে, এ দেশে আসেন ও কিছুকাল এ দেশে থাকেন। এই সময় ভগিনী নিবেদিতার সূত্রে বাংলার মনীষীসমাজ ও তরুণ দেশপ্রেমিকদের সহিত ওকাকুরার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা হয়। তাঁহার সহিত আলোচনায় ইহারা কিভাবে অনুপ্রাণিত হইয়াছিলেন তাহার বিশদ বিবরণ রক্ষিত না হইয়া থাকিলেও, শ্রীঅরবিন্দ রবীন্দ্রনাথ অবনীন্দ্রনাথ প্রভৃতির উক্তিতে তাহা আভাসিত। বাংলায় বিপ্লব আন্দোলনের প্রথম সূচনা হয় ওকাকুরার প্রেরণায়: শ্রীঅরবিন্দ এক অনুগামীর সহিত এই আন্দোলনের গোড়াপত্তন সম্বন্ধে আলোচনায় তাঁহাকে এই সম্মান দিয়া গিয়াছেন; স্বদেশী আন্দোলণের পূর্বেই তিনি বাংলার যুবশক্তিকে যেভাবে উদ্বোধিত করিয়াছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাহার সাক্ষ্য দিয়াছেন জাপানে একটি বক্তৃতায় (১৯২৯ খ্রী)।
ওকাকুরার যে বাণী সেদিন যুবচিত্তে ‘মন্ত্রের মত কাজ করিয়াছিল’ তাহা তাঁহার ‘দি আইডিয়াল্স অফ দি ঈস্ট’ (১৯০৩ খ্রী) গ্রন্থের প্রথম বাক্য—‘এশিয়া ইজ্ ওয়ান।’ এশিয়ার এই ঐক্যের বাণীতে, এশিয়ার জীবনাদর্শব্যাখ্যানে যুবসমাজের প্রতিনিধিগণ স্বদেশের সেবায়, স্বদেশের অতীতের প্রতি শ্রদ্ধায়, ভবিষ্যৎকে গড়িয়া তুলিবার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হইয়াছিলেন; রবীন্দ্রনাথ পূর্বোল্লিখিত ভাষণে তাহার সবিস্তার ব্যাখ্যা করিয়াছেন।
ওকাকুরার উৎসাহবাণী কেবল রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য্যকামী দেশকর্মীদেরই অনুপ্রাণিত করে নাই, এই শতাব্দীর সূচনায় বাংলায় চিত্রকলার নবজাগরণের নায়কদের ধ্যান-ধারণাকেও নব প্রেরণা দিয়াছিল। ওকাকুরার উদ্যোগে পরে জাপানের টাইকান প্রমুখ প্রখ্যাত কয়েকজন শিল্পী এ দেশে আসিয়া চিত্রচর্চা করেন, বাঙালী শিল্পীর সহিত জাপানের শিল্প-শৈলীর এইভাবে সাক্ষাৎ পরিচয় হয়।
পরবর্তী কালে জাপান ও চীনের সহিত রবীন্দ্রনাথের যে শ্রদ্ধার যোগ তাঁহার জীবন ও কর্মে বিশেষ চিহ্ন রাখিয়া গিয়াছে তাহার সূত্রপাত ওকাকুরার সহিত তাঁহার পরিচয়ে, এ কথা রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন।
সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রভৃতির সহিত ওকাকুরার পরিচয় অস্তরের গভীর যোগে পরিণত হইয়াছিল; একাধিকবার তিনি ভারতদর্শনে আসিয়াছিলেন।
‘দি আইডিয়াল্স অফ দি ঈস্ট’ (১৯০৩ খ্রী) ব্যতীত অপর কয়েকখানি ইংরেজী গ্রন্থেও ওকাকুরার চিন্তা লিপিবদ্ধ আছে—‘দি অ্যাওয়েকেনিং অফ জাপান’ (লণ্ডন, ১৮০৫ খ্রী), ‘দি বুক অফ টি’ (লণ্ডন ও নিউ ইয়র্ক, ১৯০৬ খ্রী); যে সকল ইংরেজী রচনা গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত ছিল ‘নিপ্পোঙ-বিজিৎসুইঙ’-এর পঁচিশ বৎসর পূর্তি উৎসবেসেগুলি ‘দি হার্ট অফ হেভ্ন্’ (টোকিও, ১৯২২ খ্রী) নামে প্রকাশিত হয়; শিল্পকলা ব্যতীত অপর বিষয়েও তাঁহার প্রবন্ধ কবিতা প্রভৃতি এই গ্রন্থে সংকলিত হইয়াছে। প্রিয়ম্বদা দেবী ওকাকুরার কয়েকটি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করিয়া প্রকাশ করেন।
দ্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘স্বর্গগত শ্রীমদ্ ওকাকুরা’, ভারতী, কার্তিক, ১৩২০ বঙ্গাব্দ; অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রানী চন্দ, জোড়াসাঁকোর ধারে, কলিকাতা, ১৩৫১ বঙ্গাব্দ; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাপান-যাত্রী, ‘গ্রন্থপরিচয়’, কলিকাতা, ১৩৬৯ বঙ্গাব্দ; পঞ্চানন মণ্ডল, ‘ভারতশিল্পী নন্দলাল’, সবিতা, আষাঢ় ১৩৩২ বঙ্গাব্দ; Okakura, Ideals of the East, Introduction by Sister Nivedita, London, 1903; Bidgelow and Lodge, “Okakura Kakuzo”, Bulletin of the Boston Museum of Fine Arts, December 1913, reprinted in Okakura, The Heart of Heaven, Tokyo, 1922; Rabindranath Tagore, On Oriental Culture and Japan’s Museum Tokyo, 1929; Surendranath Tagore, ‘Kakuzo Okakura’, Visva-Bharati Quarterly, August-October 1936; Rathindranath Tagore, On the Edges of Time, Calcutta, 1958; Kalipada Biswas, ‘A Picture that is not there’, Vigil, May 9, 1959 Barun Roy. ‘A Japanese Idealist in India’. The Statesman, January 8, 1961; Niradbaran ‘Talks with Sri Aurobindo’, Mother India, March, 1961.
ওঙ্গী, -ঙ্গে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে অল্পসংখ্যক নেগ্রিটো জাতীয় আদিবাসী বসবাস করে। ইহাদের মধ্যে যাহারা আন্দামানের দক্ষিণতম দ্বীপ লিট্ল আন্দামানে বাস করে তাহাদের নাম ওঙ্গী বা ওঙ্গে। ইহারা খর্বকায় ও কৃষ্ণবর্ণ'; দেহ সুঠাম ও পেশীবহুল। মাথায় কোঁকড়ানো চুলের ছোট ছোট গুচ্ছ।
লিট্ল আন্দামান আয়তনে ২৭০ বর্গমাইল। ওঙ্গেদের জনসংখ্যা ১৩২-এর বেশি, হয়ত ১৫০ হইবে। জঙ্গলের মধ্যে ৯টি বস্তি, সমুদ্রকূলের নিকট ১৫টি। বস্তিগুলি চারচালা, মাটির নিকট পর্যন্ত চাল নামিয়া আসে, তাহার মধ্যে কয়েকটি পরিবার একত্র বাস করে। গ্রীষ্ম বা অপর ঋতুতে এজমালি বাসগৃহ ছাড়াও কেহ কেহ শুইবার বা বিশ্রাম করিবার জন্য উপরে শুধু পাতার ছাউনি দিয়া লয়।
| ভা ২॥১১ | ৮১ |