মাননির্ণয়ের প্রচেষ্টা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওজনব্যবস্থা আগে যেমন ছিল, তেমনই চলিতে থাকে। ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রাক্কালে বিষয়টি আবার প্রাধান্য লাভ করে এবং ওজন ও মাপের মান নির্ণয় করিয়া ভারত সরকার একটি আইনও পাশ করেন। তাহার ফলে ৮০ তোলায় স্ট্যাণ্ডার্ড ১ সের এবং ৪০ সেরে স্ট্যাণ্ডার্ড ১ মন ধার্য করিয়া সর্বভারতীয় ভিত্তিতে ইহাকে গ্রহণ করার পরিকল্পনা হয়। কিন্তু আইনটি পাশ হওয়া সত্ত্বেও দুই-একটি প্রদেশ ব্যতীত ইহার বিধানসমূহ অন্যত্র কার্যকর হয় নাই।
ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও দেশের দ্রুত শিল্পায়ন প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে ওজন ও মাপের মাননির্ণয়প্রসঙ্গটি পুনরায় প্রাধান্য লাভ করে। পরিকল্পনা কমিশন অবিলম্বে ধাপে ধাপে ভারতবর্ষে মেট্রিক পদ্ধতির ওজন ও মাপ প্রবর্তনের সুপারিশ করেন। তাহারই ফলে ১৯৫৬ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে মেট্রিক পদ্ধতির ভিত্তিতে ‘ওজন ও মাপের মান নির্ণয়ন’ আইনটি ভারতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত হয় এবং ১৯৫৮ খ্রীষ্টাব্দের ১ অক্টোবর হইতে মেট্রিক পদ্ধতির ওজন ও মাপ ভারতবর্ষে আইনতঃ চালু হয়। নূতন ব্যবস্থা অনুসারে ভারতবর্ষ হইতে মন-সের-ছটাক-তোলা প্রভৃতি ওজন ধীরে ধীরে সম্পূর্ণরূপে উঠিয়া যাইবে এবং তাহাদের স্থলে গ্রাম-কিলোগ্রাম-কুইণ্ট্যাল প্রভৃতি মেট্রিক এককের ব্যবহার হইবে।
মেট্রিক পদ্ধতির ওজনের মূল একক হইল গ্রাম। ইহা আমাদের তোলার প্রায় দুই ভাগের সমান। এই মূল এককটিকে পর্যায়ক্রমে ১০ দিয়া গুণ অথবা ভাগ করিলে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় মেট্রিক এককসমূহ পাওয়া যায়। এই গুণ-ভাগ করিবার জন্য সাধারণতঃ নিম্নোক্ত ছয়টি উপসর্গের ব্যবহার হয়:
| ডেকা = ১০ গুণ | ডেসি = ১১০ ভাগ |
| হেক্টো = ১০০ গুণ | সেণ্টি = ১১০০ ভাগ |
| কিলো = ১০০০ গুণ | মিলি = ১১০০০ ভাগ |
ইহাদের মধ্যে ডেকা, হেক্টো, কিলো—এই তিনটি গ্রীক শব্দ, আর ডেসি, সেণ্টি, মিলি—এই তিনটি লাতিন শব্দ। এই উপসর্গগুলিকে ওজনের মূল একক গ্রামের সহিত যোগ করিয়া হেক্টোগ্রাম, কিলোগ্রাম, সেণ্টিগ্রাম, মিলিগ্রাম ইত্যাদি এককসমূহ পাওয়া যায়। ইহারা এক গ্রামের কত গুণ অথবা কত ভাগ ওজন নির্দেশ করে, তাহা উপরিলিখিত তালিকা হইতে পাওয়া যাইবে।
মেট্রিক পদ্ধতির বিভিন্ন এককসমূহের মধ্যে একটা সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞানসম্মত সম্বন্ধ আছে। যেমন, এক সেণ্টিমিটারপ্রাচীন ভারতবর্ষে মুদ্রার দ্বৈত ভূমিকা ছিল। অর্থাৎ যাহা ধাতুমুদ্রা তাহাই আবার ওজন বলিয়াও পরিগণিত হইত। ইংরেজ শাসনের গোড়ার দিকেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। বস্তুতঃ ১৮১৯ খ্রীষ্টাব্দের রেগুলেশনের পূর্ব পর্যন্ত মুদ্রা ও ওজন অভিন্ন ছিল। কিন্তু ১৮১৯ খ্রীষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি হইতে পূর্বোক্ত রেগুলেশনের বিধান অনুযায়ী অবস্থার পরিবর্তন হয় এবং মুদ্রায় বিশুদ্ধ রৌপ্যের পরিমাণ না বাড়াইয়া তামার সংমিশ্রণ প্রচলিত করা হয়। ফলে মুদ্রার স্ট্যাণ্ডার্ড-বিশুদ্ধতা নষ্ট হইয়া যায়। রেগুলেশনের পূর্বে এক টাকার ওজন ছিল ১৭৯৬৬৬ ট্রয় গ্রেন। তামার সংমিশ্রণের ফলে টাকার ওজন পূর্বের তুলনায় ১২২৫০১৭৯৬৬৬ ভাগ বাড়িয়া যায় এবং ওজনের একককে টাকার অঙ্কে পরিবর্তন এক জটিল গাণিতিক হিসাবের ব্যাপারে পরিণত হয়। যাহাই হউক, তাম্রমিশ্রিত এই নূতন মুদ্রার নাম দেওয়া হয় সিক্কা টাকা। কিন্তু নূতন মুদ্রা বাজারে চালু হইলেও বিশুদ্ধ রৌপ্যনির্মিত পুরাতন মুদ্রাকে ‘সিদ্ধা ওজন’—এই নূতন নামে তখনও বাজারে চালু রাখা হয় এবং বাজার-ওজনের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। পুরাতন সিক্কার প্রতি ৮০টির ওজন ১ সের, আর এইরূপ ৪০ সেরে ১ মন বলিয়া নির্ধারিত হয়। নূতন রেগুলেশনের বলে এইরূপে ‘সিক্কা ওজন’কে বাজার-মনের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা হয়।
১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দের ৭ নম্বর রেগুলেশনের বলে বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ওজনের সমতাবিধান এবং বিভিন্ন সরকারি বিভাগে ব্যবহৃত ওজনসমূহের সামঞ্জস্যবিধানের চেষ্টা হয়। টাঁকশালে নির্দিষ্ট মানের পিতলের ১ সের ও ১ তোলা ওজনের বাটখারা তৈয়ারি করাইয়া বাংলা প্রেসিডেন্সির কালেক্টরি অফিসসমূহে বিতরণের আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কার্যতঃ উক্ত রেগুলেশনের অন্তর্গত ওজনের সংস্কারমূলক বিধানসমূহের প্রয়োগ জনসাধারণের সদিচ্ছার উপর ছাড়িয়া দেওয়া হয়। কোনও রকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ কোম্পানি-পরিচালকগণের অভিপ্রেত ছিল না। পরবর্তী কালে শাসনতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক কারণবশতঃ মুদ্রায় বিশুদ্ধ রৌপ্যের পরিমাণের হ্রাসবৃদ্ধি সত্ত্বেও টাকার এক তোলা ওজন মোটামুটি অব্যাহত ছিল এবং তাহার সাহায্যে প্রয়োজনবোধে কোনও দ্রব্যের ওজনের বিশুদ্ধি পরীক্ষা৮৪