বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/১০৭

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
ওড়িয়া লোকসাহিত্য, লোকসংগীত, লোকনৃত্য
ওড়িয়া লোকসাহিত্য, লোকসংগীত, লোকনৃত্য

সংক্রান্তি উৎসবে এবং আশ্বিন মাসে কুমারপূর্ণিমার রাত্রিতে বালক-বালিকারা দুলিয়া দুলিয়া গান গায়।

 ওড়িয়া লোকনাট্যের উদ্ভবের সঠিক কাল নির্ণয় দুরূহ। তবে জনসাধারণের উপর ইহার প্রভাব খুব গভীর। আদি লোকনাট্য গীতিবহুল ‘অপেরা’-জাতীয় ছিল। রামায়ণ মহাভারত এবং অন্যান্য পুরাণের কাহিনীই এইসব নাটকের মুখ্য উপজীব্য ছিল। প্রাচীন কালে রামলীলা, কৃষ্ণলীলা ও রাম অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল এবং এইগুলি ধীরে ধীরে যাত্রায় পরিণতি লাভ করে। লেখকেরা ছিলেন পল্লীবাসী, তাঁহাদের কেহ কেহ আবার অভিনয়ের ব্যবস্থা ও তদারকিও করিতেন। প্রথমে যাত্রাগানের পালাগুলি কেবল পুরাণ ও কিংবদন্তির কাহিনী অবলম্বনে রচিত হইত। এইগুলিকে দুইটি প্রধান ভাগে ভাগ করা চলে—একটি বিয়োগান্ত, তাহাতে শেষ পর্যন্ত দুষ্ট চরিত্রের কোনও দানব-রাক্ষসের নিধন দেখানো হইত, যেমন কংস-বধ বা ইন্দ্রজিৎ নিধন। অন্যটি মিলনান্ত—নায়ক-নায়িকার মিলন বা বিবাহে তাহার সমাপ্তি, যেমন উষাপরিণয়, সুভদ্রাহরণ, রুক্মিণীবিবাহ ইত্যাদি। এই সকল যাত্রা-অভিনয়ে সাধু এবং অসাধু চরিত্রের আচরণ ও পরিণাম নিরক্ষর জনসাধারণের মনে নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করিত। যাত্রার কতকগুলি পেশাদার হাস্যরসিক সকলের মনোরঞ্জন করিত যেমন দ্বারী বা দ্বারপাল, ঝাড়ুদার ও তাহার পত্নী কিংবা বেদে। প্রতিটি চরিত্রকেই অভিনয়ের জন্য নির্দিষ্ট মুক্ত অঙ্গনে প্রবেশের সময় গান গাহিয়া আত্মপরিচয় দিতে হইত। এইসব রচনায় সরল ওড়িয়া ভাষার ফাঁকে ফাঁকে হিন্দী ও উর্দূ গান এবং কথাবার্তাও যে মধ্যে মধ্যে দেখা যায় তাহা মুসলমান প্রভাবের ফল। ‘মোগল তামাশা’ নামে একটি পালা বালেশ্বর জেলার ভদ্রকে খুবই প্রচলিত, ইহাতে মুসলমান শাসকবর্গের প্রতি যথেষ্ট ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আছে।

 গোপাল দাস, বৈষ্ণব পাণি এবং বালকৃষ্ণ মহাস্তি হইলেন বর্তমান শতাব্দীতে প্রসিদ্ধ পালা লেখক ও যাত্রাদলের ব্যবস্থাপক। পুরাতন সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বর্তমান সমাজের চিত্রণে বৈষ্ণব পাণি বিশেষ কৃতিত্ব দেখাইয়াছেন। তাঁহার মত অধিকসংখ্যক যাত্রার পালাও কেহ লেখেন নাই। আধুনিক শিক্ষার ক্ষতিকর প্রভাব, নগর ও গ্রামজীবনের গুরুতর অসংগতি, কলিকাতার পাটকলে চাকুরিপ্রার্থী শ্রমিকশ্রেণীর দুঃখদারিদ্র্য আশা-আকাঙ্ক্ষা তাঁহার লেখায় ফুটিয়া উঠিয়াছে।

 বালকৃষ্ণ মহান্তি বৈষ্ণব পাণির ন্যায় অভিনেতা ও লেখক ছিলেন। বাংলা দেশের গ্রামে পর্যস্ত তাঁহার যাত্রা-
অভিনয়ের খ্যাতি ছড়াইয়াছিল। ওড়িয়া নাট্যামোদীগণের নিকট গোপাল দাস এবং জগু ওঝাও বিশেষ প্রিয়। অন্যান্য গীতিনাট্যরচয়িতাগণের মধ্যে ভিখারি, বন্ধু, মাগুনি, দুষ্কর, পদ্মলব এবং কৃষ্ণপ্রসাদের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এখনকার দিনের রুচির উপযোগী করিবার জন্য ইহার যথেষ্ট পরিবর্তন হইয়াছে এবং এখনও জনসাধারণের শিক্ষা ও আনন্দের ইহা প্রধান উৎস। দক্ষিণে গঞ্জাম জেলায় ‘রাধাপ্রেমলীলা’র প্রচলন অধিক। রাধা এবং গোপীগণের সহিত শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা শরৎ ও বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হয়। এইগুলি যথাক্রমে শারদ রাস ও বাসন্ত রাস নামে পরিচিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পিণ্ডিকি শ্রীচন্দন শারদ রাস এবং বাসন্ত রামলীলা রচনা করেন। প্রায় প্রতি গ্রামেই সংকীর্তনের দল দেখা যায়। সংকীর্তনের পদকর্তাদের নাম অজ্ঞাত।

 রাসলীলা সংগীত ও যাত্রাগুলির মত অধিকাংশ লোকনৃত্য গীতসহযোগে অনুষ্ঠিত হয়। পালা নামে আর এক ধরনের অনুষ্ঠান ও ওড়িশায় প্রচলিত। সন্ত কবীর যেমন সারা ভারতে হিন্দু-মুসলমান মিলিত সংস্কৃতির প্রতীক, সত্যপীরের কাহিনী অবলম্বনে রচিত এই পালাগুলিও সেইরূপ উভয় সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির পরিচয় বহন করিতেছে। এই পালায় ঘাগরা এবং গোল টুপি পরা চার-পাচ জন অভিনেতা থাকেন। দলের একজন বন্দনাগান করেন আর যিনি দোহা ধরেন তাঁহার নাম পালিয়া, শেষে সকলে মিলিয়া বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে সমস্বরে গাহিতে থাকেন। এই গানগুলি ওড়িশার প্রাচীন লেখকদের লেখা। গানগুলিকে পালাদল অতি সহজ পায়ের কাজের মধ্য দিয়া নৃত্যরূপ দেন। দাসকাঠিয়া পালাটি সবচেয়ে সরল। মাত্র দুইজনে কাঠের খঞ্জনি বাজাইয়া দ্রুত লয়ে হাতের ভঙ্গিতে গান গাহিতে থাকেন। পালাকারদের মত তাহারাও যুদ্ধের বর্ণনার সময় গাহিতে গাহিতে নাচিতে থাকেন। শিব-পার্বতীর বিবাহ লইয়া ‘দাণ্ডনাটে’র পালা অতি পুরাতন। ওড়িশার পাহাড়ি অঞ্চলে এই নাচের চল খুব বেশি। নর্তকেরা পালা আরম্ভের পূর্বে গান গাহিতে গাহিতে লোকের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করিয়া বেড়ায় এবং এই সময় তাহারা দেবতার পূজার নিমিত্ত একবেলা মাত্র আহার করে। দাণ্ডনাটের পালার মধ্যে যেমন বিভিন্ন দেব-দেবীর গীতি ও স্তুতি থাকে তেমনই সমসাময়িক সমাজের প্রতি কৌতুকের ইঙ্গিতও থাকে।

 ওড়িয়া লোকনৃত্যের মধ্যে ‘ছৌ’নাচ অত্যন্ত পরিণত

৮৮