কলিকাতা, ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ; অবন্তী দেবী, ভক্তকবি মধুসূদন রাও ও উৎকলে নবযুগ, কলিকাতা, ১৩৭০ বঙ্গাব্দ; Suniti Kumar Chatterji, Languages and Literatures of Modern India, Calcutta, 1953.
ওড়িশা, উড়িষ্যা ওড়িয়া-ভাষীদের দেশকে বাংলায় ‘উড়িষ্যা’ এবং উড়িয়া ভাষায় ওড়িশা লেখা হয়। জাতি-বিশেষের ‘ওড্র’, ‘উড্র’ বা ‘ঔড্র’ নামের সহিত দেশাংশবোধক ‘বিষয়’ শব্দের যোগে প্রাচীন ‘ওড্রবিষয়’ নামটির সৃষ্টি হয়। ইহা হইতে ‘ওড়িশা’ নামের উদ্ভব হইয়াছে। এক সময়ে কশাই (কপিশা) ও বৈতরণী নদীর মধ্যবর্তী ভূভাগ (অর্থাৎ আধুনিক বালেশ্বর জেলা ও মেদিনীপুরের কিয়দংশ) ‘উৎকল’ নামে খ্যাত ছিল এবং বৈতরণী হইতে গোদাবরী (পরে কৃষ্ণা হইতে মহানদী) পর্যন্ত বিস্তৃত দেশকে কলিঙ্গ বলা হইত। প্রাচীন কলিঙ্গ দেশের রাজধানী ছিল ভুবনেশ্বরের নিকটবর্তী তোসলি নগরী। আদি মধ্য যুগে মেদিনীপুর হইতে গঞ্জাম পর্যন্ত দেশের নাম ছিল তোসলি। সোনপুর-সম্বলপুর অঞ্চলকে মধ্য যুগ পর্যন্ত কোশল দেশের অন্তর্গত বলিয়া গণ্য করা হইত। সম্ভবতঃ ওড্রেরা প্রথমে আধুনিক ময়ূরভঞ্জ-সিংভূম-মানভূম অঞ্চলে বাস করিত। ওড্রজাতীয় রাজগণের অধিকার বিস্তারের ফলে ভৌগোলিক নামটির অর্থবিস্তৃতি ঘটে। ফলে ওড্র ও উৎকল নামদ্বয় সমার্থক হইয়া দাড়ায়। পরে সমগ্র ওড়িয়াভাষী অঞ্চল সম্পর্কে নাম দুইটি প্রযুক্ত হইতে থাকে। বৌধায়নধর্মসূত্রে (খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম-ভাগ) হইতে জানা যায় যে, কলিঙ্গ প্রভৃতি অনার্য দেশে ভ্রমণ করিলে আর্যগণকে প্রায়শ্চিত্ত করিয়া শুদ্ধ হইতে হইত। পরবর্তী কালের একটি পৌরাণিক শ্লোকে বলা হইয়াছে যে, তীর্থযাত্রা উপলক্ষে কলিঙ্গাদি দেশে ভ্রমণ করিতে গেলে প্রায়শ্চিত্তের প্রয়োজন হইত না। প্রাচীন কলিঙ্গের সীমান্তে অবস্থিত বিরজা তীর্থ বা যাজপুর সেই যুগে পূর্ব ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থান বলিয়া গণ্য হইত। আবার মহাভারতের কর্ণপর্বে (৪৫শ অধ্যায়) দেখা যায়, কলিঙ্গদেশের অধিবাসীদের শাশ্বত ধর্মজ্ঞ বলিয়া খ্যাতি ছিল।
খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে মগধে নন্দবংশের প্রতিষ্ঠাতা মহাপদ্ম নন্দ কলিঙ্গ জয় করেন। খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগে মৌর্যরাজ চন্দ্রগুপ্তের পৌত্র অশোক পুনরায় কলিঙ্গ দেশ জয় করেন। মগধসাম্রাজ্যের পতনের পর খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে কলিঙ্গে ‘মহামেঘবাহন’ নামকখ্রীষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে মগধে গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হইবার কিয়ৎকাল পরে কলিঙ্গ দেশে গুপ্ত অধিকার প্রসারিত হয়। ষষ্ঠ শতাব্দীতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ঘটিলে ওড়িশায় কয়েকটি রাজবংশ কিছুকাল স্বাধীনভাবে রাজত্ব করিতে থাকে। কিন্তু শীঘ্রই সপ্তম শতাব্দীর সূচনায় মুর্শিদাবাদের অন্তর্গত কর্ণসুবর্ণের গৌড়রাজগণ গঞ্জাম জেলা পর্যন্ত অধিকার করেন। কটক-বালেশ্বর অঞ্চলের দত্তবংশীয়েরা এবং গঞ্জামের শৈলোদ্ভবগণ গৌড়-রাজের সামন্ত ছিলেন।
৮৩১ খ্রীষ্টাব্দে যাজপুবের ভৌমকরবংশীয়গণ এক পরাক্রান্ত রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁহাদের অধিকার মেদিনীপুরের পশ্চিমাংশ হইতে গঞ্জাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। একাদশ শতাব্দীর প্রথন ভাগে ভৌমকর রাজ্য সোনপুর-সম্বলপুর অঞ্চলের সোমবংশীয় নৃপতি তৃতীয় মহাশিবগুপ্ত যযাতির করতলগত হয়। এই যযাতিকেই মাদলা-পঞ্জীর বিকৃত বিবরণে যযাতি কেশরী নামে অভিহিত করা হইয়াছে। তৃতীয় যযাতির পুত্র উদ্দ্যোতকেশরী সোনপুর-সম্বলপুর অঞ্চলের অধিকার জনৈক আত্মীয়ের হস্তে ন্যস্ত করিয়া যাজপুর হইতে রাজোর দক্ষিণ ভাগ শাসন করিতে থাকেন। ১১১২ খ্রষ্টাব্দের কিয়ৎকাল পূবে শ্রীকাকুলমের অন্তর্গত কলিঙ্গ নগরের গঙ্গবংশীয় নৃপতি অনন্তবর্মা চোড়গঙ্গ উদ্দ্যোতকেশরীর উত্তরাধিকারীগণকে উৎখাত করিয়া পুরী-কটক অঞ্চল অধিকার করেন। চোড়গঙ্গদের সাম্রাজ্য ভাগীরথীর তীর হইতে গোদাবরী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গঙ্গবংশীয়েরা শৈব ছিলেন, কিন্তু চোড়গঙ্গ বৈষ্ণবধর্ম অবলম্বন করেন এবং পুরীর দেবতা জগন্নাথ পুরুষোত্তমের ভক্তরূপে তাঁহার মন্দির নির্মাণ করিয়া দেন।
চোড়গঙ্গের উত্তরাধিকারীদিগের মধ্যে তৃতীয় অনঙ্গভীম (১২১১-৩৯ খ্রী) জগন্নাথের পরম ভক্ত ছিলেন। তিনি স্বীয় রাজ্য দেবতার নামে উৎসর্গ করিয়া জগন্নাথের সামস্তরূপে দেশ শাসন করিতে থাকেন। এ সময় হইতেই ওড়িশার সম্রাটগণ কর্তৃক দেবতার ভূত্যরূপে রাজ্যশাসনের আরম্ভ। তৃতীয় অনঙ্গভীমের পুত্র প্রথম নরসিংহ (১২১৩-৬৪ খ্রী) কণারকের সূর্যমন্দির নির্মাণ করান (‘কণারক’ দ্র)। তাঁহার সেনাদল বাংলার মুসলমান রাষ্ট্রের রাজধানী লক্ষ্মণাবতী অবরোধ করিয়াছিল।৯৩