বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/১১৩

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
ওড়িশা
ওড়িশা

 ১৪৩৫ খ্রীষ্টাব্দে গঙ্গবংশের শেষ রাজা চতুর্থ ভানুর রাজ্য তদীয় অমাত্য সূর্যবংশীয় কপিল, কপিলেন্দ্র বা কপিলেশ্বরের হস্তগত হয়। কপিলের বংশ ‘গজপতিবংশ’ নামে প্রসিদ্ধ। তিনি তৎকালীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতি ছিলেন। তাঁহার সাম্রাজ্য ভাগীরথী নদীর তীর হইতে মাদ্রাজের তিরুচ্চিরাপ্পল্লি জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কপিলের পৌত্র রুদ্র, বীররুদ্র বা প্রতাপরুদ্র (১৪৯৭-১৫৩৯ খ্রী) বিজয়নগরাধিপতি কৃষ্ণদেবরায়ের নিকট পরাজিত হইয়াছিলেন। তিনি চৈতন্যের ভক্তশিষ্য ছিলেন। গজপতি বংশের পতনের কিয়ৎকাল পরে অন্ধ্রদেশীয় মুকুন্দ হরিচন্দন (১৫৫৯-৬৮ শ্রী) ওড়িশার সিংহাসন অধিকার করেন। তিনিই ওডিশার শেষ স্বাধীন হিন্দু রাজা। অতঃপর ওড়িশা আফগানজাতীয় মুসলমান-দিগের করতলগত হয়। কয়েক বৎসর পরে আফগানেরা মোগল সম্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৫ স্ত্রী) সেনাদল কর্তৃক বিতাড়িত হয় এবং ধীরে ধীরে ওড়িশায় মোগল অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

 ১৬৪৬ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত মোগল সম্রাটগণ ওড়িশা শাসনের জন্য স্বতন্ত্র সুবাদার নিযুক্ত করিতেন। কিন্তু ঐ বৎসর সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা বাংলা, বিহার ও ওড়িশার সুবাদার নিযুক্ত হন। সুজা ঔরঙ্গজেবের সহিত সংঘর্ষে অগ্রসর হইবার পর ওড়িশার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজগণ বিদ্রোহী হন এবং দেশে এক ভয়ানক অরাজকতা উপস্থিত হয়। ১৬৬০ খ্রষ্টাব্দে খান-ই-দুরান্ ওড়িশার সুবাদার নিযুক্ত হন। তাঁহার চেষ্টায় বিদ্রোহ দমিত হইলে দেশে শান্তি স্থাপিত হইয়া ছল। ১৬৬৯ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট ঔরঙ্গজেব হিন্দুগণের নবনির্মিত মন্দিরাদি ধ্বংসের আদেশ দেন এবং নূতন মন্দির নির্মাণ নিষিদ্ধ করেন। ১৬৯৭ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার প্রেরিত সৈয়দ আহ্‌মদ বিলগ্রামী পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের কাষ্ঠনির্মিত মূর্তিসমূহ ধ্বংস করিয়াছিলেন।

 ১৭১৩ খ্রীষ্টাব্দে মুশিদকুলী খাঁ বাংলা, বিহার ও ওড়িশার নবাব নিযুক্ত হন। কয়েক বৎসর পর আলীবর্দী খাঁ (১৭৪০-৫৬ খ্রী) নবাব নিযুক্ত হইয়া ওড়িশার শাসনকর্তা দ্বিতীয় মুর্শিদকুলীকে বিতাড়িত করেন। তখন দ্বিতীয় মুর্শিদের মিত্র মীর হবিব নাগপুরের মারাঠা নরপতি রঘুঙ্গী ভোঁসলার সাহায্যে আলীবর্দীকে দমন করিতে প্রয়াসী হইলেন। ফলে রঘুঙ্গীর পুনঃপুনঃ আক্রমণে বাংলা এবং ওড়িশার অধিবাসীদের বহু অত্যাচার সহ্য করিতে হয়। অতঃপর আলীবর্দী রঘুজীর সহিত সন্ধি করিতে বাধ্য হন এবং ১৭৫১ খ্রীষ্টাব্দ হইতে প্রকৃত পক্ষে ওড়িশায় রঘুজীর আধিপত্য স্বীকার করেন। ওড়িশার মারাঠা
শাসকদিগের মধ্যে শিবরাম ভট্ট সুযোগ্য শাসনকর্তা ছিলেন।

 ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দে ঈস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ্‌ আলমের নিকট হইতে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করেন। এদিকে ওড়িশায় ভোঁসলা শাসন ক্রমশঃ দুর্বল হইয়া পড়িতেছিল। ১৮০৩ খ্রীষ্টাব্দে কটক-পুরী অঞ্চল ইংরেজ কর্তৃক বিজিত হইয়া বাংলা প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত হয়। ইতিপূর্বেই গঞ্জাম অঞ্চল ইংরেজ রাজ্যের মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত হইয়াছিল। ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দে সম্বলপুর অঞ্চলে ইংরেজ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অঞ্চলের অনেকাংশ ইংরেজ রাজ্যের মধ্য প্রদেশের সহিত সংযুক্ত হইল। মুসলমান ও মারাঠা আমলে ওড়িশায় অত্যাচার-অবিচারের অভাব ছিল না। কিন্তু ইংরেজ অধিকারের পর প্রজাগণের দুর্দশা চরমে পৌঁছিল। খাজনার দায়ে বহু লোকের ভূসম্পত্তি নিলামে বিক্রয় হইয়া গেল।

 ১৮১৭ খ্রীষ্টাব্দে ওড়িশায় পাইক-বিদ্রোহ হয়। পাইকেরা ছিল ওড়িশার ক্ষুদ্র-বৃহৎ রাজাদিগের পদাতিক সৈন্য। প্রভুর প্রসাদে তাহারা নিষ্কর জমি ভোগ করিত এবং প্রয়োজন উপস্থিত হইলে তাঁহার সেবায় প্রাণপাত করিতেও কুণ্ঠিত হইত না। যুদ্ধবিগ্রহ, রাজ্যে শান্তিরক্ষা, বিদ্রোহ-দমন প্রভৃতি তাহাদের প্রধান কার্য ছিল। তাহাদের অধিকাংশই ছিল কৃষিজীবী। কোম্পানির ভূমিবাবস্থার ফলে পাইকেরা ভূমিহীন হয় এবং ইহাই পাইক-বিদ্রোহের প্রধান কারণ। এই বিদ্রোহে খুর্দার রাজা মুকুন্দদেব এবং তাঁহার সেনাপতি জগবন্ধু বিদ্যাধর বিদ্রোহীগণের নেতৃত্ব করিয়াছিলেন। গুমসরের কন্ধজাতীয় আদিবাসীরাও বিদ্রোহীদের সহিত যোগ দিয়াছিল। বিদ্রোহ সহজেই দমিত হইল। কিন্তু শীঘ্র রাজস্ব-ব্যবস্থার কোনও উন্নতি হয় নাই।

 উনবিংশ শতাব্দীতে ওড়িশার কতকাংশ ব্রিটিশ শাসিত এবং অপরাংশ দেশীয় রাজগণের অধীন ছিল। আবার ইংরেজের অধীন অংশও একটিমাত্র প্রদেশের অন্তর্গত ছিল না। ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দে বাংলা প্রেসিডেন্সিকে ভাগ করিয়া পূর্ব বাংলা ও আসাম এবং পশ্চিম বাংলা, বিহার ও ওড়িশা এই দুইটি প্রদেশ গঠিত হয়। কিন্তু ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দে বাংলা ও আসাম দুইটি স্বতন্ত্র প্রদেশে পরিণত হইল। পরিশেষে ইংরেজ সরকারের এক ঘোষণা অনুসারে ১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারি ওড়িশা বিহার হইতে বিচ্ছিন্ন হয় এবং গঞ্জাম জেলার অধিকাংশ ও মধ্য প্রদেশের অংশবিশেষ সংযুক্ত করিয়া স্বতন্ত্র ওড়িশা প্রদেশ গঠিত হয়। তখন

৯৪