বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/১৩৯

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
ওশিয়ানিয়া
ওশিয়ানিয়া

দ্বীপগুলি সাধারণতঃ নিম্ন প্রবালবলয় অপেক্ষা উর্বর―নারিকেল ও কেয়া জাতীয় উদ্ভিদে পূর্ণ। অপেক্ষাকৃত অনুর্বর জমিতে গুল্ম ও ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ জন্মে। লাভা-গঠিত উচ্চ দ্বীপগুলিতে সাধারণতঃ নিবিড় বনভূমি ও বড় বড় কৃষিক্ষেত্র বিদ্যমান। মহাদেশীয় দ্বীপগুলিতে ভূমির উচ্চতা ও বৃষ্টিপাতের তারতম্য আছে। বৃষ্টিপাতবহুল নিম্নভূমি অঞ্চলে বৃহৎ পত্রযুক্ত সুন্দরী জাতীয় (ম্যানগ্রোভ) বৃক্ষ বিদ্যমান। বৃষ্টিবিরল উচ্চভূমিতে শুষ্ক তৃণপ্রান্তর বিরাজিত। ক্রান্তীয় বনভূমি বা উচ্চ তুষারাবৃত অঞ্চলের নিকট আলপাইন বৃক্ষও দেখা যায়। কৌরি প্রভৃতি বৃক্ষ কাষ্ঠ ব্যবসায়ের জন্য ব্যবহার করা হয়।

 বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ জন্মাইলেও সাধারণভাবে নারিকেল জাতীয় উদ্ভিদই প্রধান। এখানে ব্রেড ফ্রুট ও পেঁপে জাতীয় নানা প্রকার ফল উৎপন্ন হয়। চন্দন কাঠ এককালে বিদেশীদের প্রধান আকর্ষণের বস্তু ছিল। কচু ও কেয়া জাতীয় বৃক্ষের চাষ যথেষ্ট পরিমাণে হয়। আজকাল অনেক জঙ্গল পরিষ্কার করিয়া বিদেশীরা নানা বাগিচা করিয়া যথেষ্ট উপার্জন করে। একমাত্র হাইটি দ্বীপে দেড়শ কোটি ডলারের চিনি ও আনারস উৎপন্ন হয়। অনেক স্থলে ধানের চাষও হয়। সাগুর চাষেরও প্রচলন আছে।

 প্রশান্ত মহাসাগর একাধারে খাদ্যসম্পদ ও বাণিজ্যসম্পদে পরিপূর্ণ। তটবর্তী অঞ্চলে চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক ইত্যাদি স্থানীয় লোকেদের খাদ্য। সমুদ্রজাত উদ্ভিদ পলিনেশিয়াবাসীরা খাদ্যরূপে ব্যবহার করে; সার রূপেও ব্যবহৃত হয়। মুক্তাব্যবসায় এই স্থানের একটি প্রধান উপার্জনের উপায়। টুয়ামাটো প্রভৃতি কয়েকটি প্রবালবলয় মুক্তাচাষের জন্য বিখ্যাত। প্রবাল গৃহসজ্জার একটি উপকরণ। মাইক্রোনেশিয়া ও তাহার নিকটবর্তী অনেক স্থলে মৎস্যচারণক্ষেত্র আছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তিমি শিকার ও তাহার তেলের ব্যবসায় পলিনেশিয়ার দ্বীপগুলির একটি সমৃদ্ধিশালী ব্যবসায় ছিল। শঙ্খ ও শামুক অলংকার ও বোতামের জন্য বিদেশে প্রেরণ করা হয়।

 বহু প্রাচীন কাল হইতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হইতে ভিন্ন ভিন্ন জাতি এই মহাদেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত দ্বীপগুলিতে আসিতে থাকে। ক্রমশঃ ইহারা সমুদ্রগামী জাতি হিসাবে পরিণত হয়। নৌচালনা ও অন্যান্য সামুদ্রিক বিষয়ে আরও দক্ষ হইয়া প্রয়োজনের খাতিরে ইহারা ক্রমশঃ আরও পূর্বাভিমুখে গমন করিয়া বহুদূরস্থিত দ্বীপসমূহে ছড়াইয়া পড়ে। পুরাকালে আমেরিকা ও এশিয়ার মধ্যে বিস্তৃত মহাসাগরে এই দ্বীপগুলিই যাতায়াতের সেতু হিসাবে
কাজ করিয়াছিল বলা চলে। যুগ যুগ ধরিয়া আগত এই বিভিন্ন জাতির শারীরিক গঠনে, ভাষাতে ও সংস্কৃতিতে বিপুল বৈষম্য ছিল।

 মেলানেশিয়ার মধ্য অঞ্চলের অধিবাসীদের আকৃতিতে ঘন ভ্রুবিশিষ্ট, গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ, কুঞ্চিত কেশ, দীর্ঘ অস্ট্রেলয়েডদের বৈশিষ্ট্য লক্ষিত হয়। গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ, ঢেউখেলানো কেশদাম ও বৃত্তাকার মস্তকবিশিষ্ট হ্রস্বকায় নেগ্রিটো জাতি নিউগিনির পার্বত্য অঞ্চলে দেখা যায়। নিউগিনির উত্তর-পূর্ব ও মেলানেশিয়ার পূর্ব দিকের অন্যান্য দ্বীপগুলিতে মহাসাগরীয় নিগ্রো জাতিরা থাকে। ইহারা অপেক্ষাকৃত লম্বা ও নেগ্রিটো জাতি অপেক্ষা সংস্কৃতিতে অধিক উন্নত অনেকে মনে করেন অস্ট্রেলয়েড ও নেগ্রিটো জাতির সংমিশ্রণে ইহাদের উদ্ভব।

 মেলানেশিয়াবাসীরা অত্যন্ত উদ্যমশীল। মৎস্যশিকার ও ক্যানো লইয়া ব্যবসায়ের জন্য সমুদ্রে যাওয়া-আসা ইহাদের প্রধান পেশা। মৃত্তিকা পোড়াইয়া বাসন তৈয়ারি করিতে জানে। ইহারা জাদুবিদ্যায় বিশ্বাসী। কচু ও চুপড়ি আলু ইহাদের প্রধান খাদ্য।

 পশ্চিম মাইক্রোনেশিয়াবাসীর সহিত ইন্দোচীন ও ফিলিপ্পীন দেশের বাদামি গাত্রবর্ণ ও কৃষ্ণবর্ণ কেশবিশিষ্ট মঙ্গোলয়েড জাতির সাদৃশ্য আছে। ইহাদের মধ্যে কিছু কিছু অস্ট্রেলয়েড ও নেগ্রিটো জাতির চিহ্নও বিদ্যমান। মাইক্রোনেশিয়ার পূর্ব অংশের অধিবাসীরা মঙ্গোলয়েড ও ককেশীয় জাতির সংমিশ্রণে উদ্ভুত। ইহারা নৌকা তৈয়ারিতে ও নৌচালনায় দক্ষ। মৎস্য ও নারিকেল এবং কেয়া জাতীয় বৃক্ষের ফল ব্রেডফ্রুট ইহাদের প্রধান খাদ্য।

 পলিনেশিয়াবাসীদের সহিত ককেশীয় জাতিসমূহের দেহগঠনে মিল আছে। ম্যাডাগ্যাস্কার হইতে ঈস্টার দ্বীপ পর্যন্ত ইহাদের বিস্তৃতি। ইহারা উন্নত, সমুদ্রযাত্রায় বিশেষ দক্ষ। গৃহনির্মাণের কাজে নিপুণ। টঙ্গা দ্বীপের সোপানযুক্ত কবরের ও টাহিটি দ্বীপের উচ্চ মন্দিরগুলির স্থাপত্যরীতি ইহাদেরই আবিষ্কার। ইহাদের সংস্কৃতি বেশ উন্নত। প্রস্তরমূর্তি নির্মাণেও ইহারা দক্ষ।

 ইওরোপীয়গণ প্রশান্তমহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে আসিবার পূর্ব হইতে দ্বীপপুঞ্জের আদি অধিবাসীরা প্রধানতঃ মৎস্যশিকার বা কৃষিকার্যের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিত। মৎস্যশিকার, কৃষিকার্য প্রভৃতি সর্ববিধ কার্যে তাহাদের সহজ প্রণালী প্রত্যেক গ্রামকেই খাদ্য ও পানীয়ের বিষয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ করিয়া তুলিয়াছিল। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের বড় বড় দ্বীপগুলিতে কোনও কোনও সম্প্রদায় দেশের অভ্যন্তরে অরণ্যে ধান্য উৎপাদন ও অন্যান্য বনজ সম্পদ হইতে আহার্য

১২০