বেসাণ্টের মতের সমর্থনে কোনও প্রমাণ নাই। কংগ্রেসের ইতিহাস রচয়িতা এই সমুদয় মত প্রত্যাখ্যান করিয়া লিখিয়াছেন যে একটি নিখিল ভারতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কল্পনা বহু লোকেরই মানসে জাগিতেছিল, হিউম তাহাকে বাস্তব রূপ দেন।
বাস্তবিক পক্ষে কিন্তু এই কল্পনা দুই বৎসর পূর্বেই অর্থাৎ ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায় ভারত সভার (ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন) আমন্ত্রণে যে জাতীয় সমিতির (ন্যাশন্যাল কনফারেন্স) অধিবেশন হয় তাহাতেই বাস্তব রূপ পাইয়াছিল। বঙ্গ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক বিবর্তনের ফলে জাতীয় সমিতির প্রতিষ্ঠা হয়। ইহাতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের রাজনীতিক নেতৃগণ যোগদান করেন এবং পরবর্তী কালে কংগ্রেসে যে সমুদয় বিষয় যেভাবে আলোচিত হয় এই জাতীয় সমিতিতেও মোটামুটি তাহাই হইয়াছিল। কলিকাতায় ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে এই জাতীয় সমিতির দ্বিতীয় অধিবেশন যেদিন শেষ হয়, তাহার ঠিক পর দিনই বোম্বাই নগরীতে কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন হয়। ইহার উদ্যোক্তাগণ জাতীয় সমিতির অধিবেশনের বিবরণ জানিবার জন্য সুরেন্দ্রনাথকে চিঠি লিখিয়াছিলেন। সুতরাং কলিকাতার জাতীয় সমিতিই যে কংগ্রেসের আদর্শ ছিল এবং ইহার প্রেরণা জাগাইয়াছিল—ইহাই খুব যুক্তিসংগত অনুমান বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর বোম্বাই নগরীতে হিউম কর্তৃক আহূত জাতীয় সম্মিলনের প্রথম অধিবেশন হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ হইতে ৭২ জন প্রতিনিধি ইহাতে যোগদান করেন। কলিকাতার প্রসিদ্ধ ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সভাপতি পদে বৃত হন। তাঁহার অভিভাষণে তিনি বলেন যে এই সম্মিলনের মূল উদ্দেশ্য চারিটি—প্রথম, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে যাঁহারা দেশের উন্নতির জন্য কাজ করিতেছেন তাঁহাদের মধ্যে পরিচয় ও সৌহার্দ্য স্থাপন করা। দ্বিতীয়, এই উপায়ে জাতি-ধর্ম ও প্রাদেশিক মনোবৃত্তির সংকীর্ণতা দূর করিয়া জাতীয় ঐক্যসাধনের পথে অগ্রসর হওয়া। তৃতীয়, শিক্ষিত ব্যক্তিগণের মধ্যে আলোচনার দ্বারা গুরুতর সামাজিক সমস্যা সমাধনের পথ নির্ধারণ করা। চতুর্থ, রাজনৈতিক উন্নতির জন্য আগামী বৎসর কি কার্যপ্রণালী অবলম্বন করা উচিত তাহা স্থির করা। এই সভায় সরকারের নিকট পাঠাইবার জন্য নয়টি সুপারিশ গৃহীত হয়। ইহার মধ্যে নিম্নলিখিতগুলি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য: ১. ভারতের শাসনব্যবস্থার তদন্তের জন্য একটি রাজকীয় সমিতি (রয়্যাল কমিশন) নিয়োগ করা ২. সেক্রেটারি অফ স্টেটের পরামর্শ সভাকয়েকজন সরকারি কর্মচারী এই সকল সুপারিশের খসড়া করিতে সাহায্য করেন এবং বোম্বাই হাইকোর্টের জজ রানাডে এই সভায় বক্তৃতা দেন। দুইজন মুসলমান উক্ত অধিবেশনে যোগদান করিয়াছিলেন।
এই প্রথম অধিবেশনেই স্থির হয় যে অতঃপর এই সম্মিলন ‘ভারতের জাতীয় কংগ্রেস’ (ইণ্ডিয়ান ন্যাশন্যাল কংগ্রেস) নামে অভিহিত হইবে। সভায় রাজভক্তির স্রোত বহিয়াছিল; এবং মন্তব্যগুলি যুক্তিপূর্ণ ও তাহার স্বপক্ষে বক্তৃতা খুব নরম সুরেরই হইয়াছিল। তথাপি ইংরেজগণ ইহা বিদ্রোহসূচক মনে করিলেন। লণ্ডনের বিখ্যাত টাইম্স পত্রিকা লিখিলেন: কংগ্রেসের দাবি মিটানোর অর্থ ভারতকে স্বায়ত্তশাসন দিয়া আমাদের দেশে ফিরিয়া আসা; কিন্তু কয়েকজন বাক্যবাগীশের কথায় আমরা ভারত ছাড়িব না।
কর্তৃপক্ষ কংগ্রেসের আবেদনে কর্ণপাত করিলেন না। কিন্তু কংগ্রেসে গৃহীত প্রস্তাবগুলির বহুল প্রচার হইল এবং বহু স্থানে রাজনৈতিক সভায় ইহার আলোচনা হইল। ইহাতে ভারতের রাজনৈতিক জীবনে যে বেশ সাড়া জাগিয়াছিল পর বৎসর কলিকাতায় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে তাহার প্রমাণ পাওয়া গেল। এবারে কংগ্রেসে যাঁহারা যোগদান করেন তাঁহারা সকলেই স্থানীয় কোনও সভা-সমিতি কর্তৃক প্রকাশ্য সভায় রীতিমত প্রতিনিধি নির্বাচিত হন এবং কংগ্রেসের অধিবেশনের পূর্বে তাহাদের নাম প্রতিনিধিরূপে রেজিস্ট্রি করা হয়। ইহার পর প্রতি অধিবেশনেই এই প্রণালী অনুসৃত হয়। কিন্তু প্রথমবারে এ সকল কিছুই হয় নাই; বিশিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি সদস্যরূপে যোগ দিয়াছিলেন। কলিকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে ৫০০ প্রতিনিধি নির্বাচিত হইয়াছিলেন। ইহাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ৪৩৪ জন।
কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে বাংলার প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যোগদান করেন নাই; দ্বিতীয় অধিবেশনের ব্যবস্থা করিবার জন্য হিউম সাহেব যখন কলিকাতায় আসিলেন তখন তিনি বুঝিতে পারিলেন যে সুরেন্দ্রনাথকে বাদ দিয়া কোনও১৩১