বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/১৫৪

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
কংগ্রেস
কংগ্রেস

যখন গান্ধীজী সত্যাগ্রহের প্রস্তাব করেন, তখন কংগ্রেসের মারফত করেন নাই, সত্যাগ্রহ সভা নামে এক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানকে আশ্রয় করেন।

 যাহাই হউক, ১৯২০ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ ঠিকভাবে কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ ক্রমে তাঁহার সহিত আদর্শে না হইলেও কার্যতঃ সহমত হইলেন তাহা এই প্রবন্ধেই পূর্বে বর্ণিত হইয়াছে। অসহযোগ আন্দোলন (‘অসহযোগ আন্দোলন’ দ্র) স্তিমিত হইলে ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দ হইতেই সভ্যগণের চিন্তাক্রমে একটি বিভেদের উদয় হয়। কেহ কেহ বলেন, কাউন্সিল বর্জনের নীতি পরিহার করিয়া বরং এইবার কাউন্সিলের মধ্যেও স্বরাজের আন্দোলন পরিচালনা করা কর্তব্য। আশঙ্কা ছিল যে গান্ধীজী-পরিচালিত কংগ্রেসের বাহিরে ইহার ফলে নূতন একটি রাজনৈতিক দল গড়িয়া উঠিতে পারে। কিন্তু গান্ধীজী এরূপ ভাঙনের সম্পূর্ণ বিপক্ষে ছিলেন। তাঁহারই পরামর্শে ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দে কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হয় যে স্বরাজ্য পার্টি কংগ্রেসের অঙ্গ হিসাবেই কাউন্সিলের অভ্যন্তরে স্বীয় কার্যক্রম অনুসরণ করিয়া চলিবে (‘স্বরাজ্য পার্টি’ দ্র)।

 দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বাংলা দেশে কাউন্সিলে ব্রিটিশ সরকারকে নানা ভাবে বিপর্যস্ত করিয়া তুলিলেন। উপরন্তু হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের জন্য তিনি ১৭ ডিসেম্বর ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দে উভয়পক্ষের মধ্যে এক শর্তাবলী স্বীকার করাইয়া লন। ইতিমধ্যে গান্ধীজী গ্রামে উৎপাদন ব্যবস্থার সংস্কারকল্পে কংগ্রেসেরই প্রস্তাবানুযায়ী খাদি উৎপাদনের ব্যবস্থা করেন। উপরন্তু ১৯২৩ হইতে ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে মেদিনীপুরে ইউনিয়ন বোর্ড আন্দোলন, পাঞ্জাবে গুরুদ্বারা সত্যাগ্রহ, কেরলের ভাইকমে অস্পৃশ্যতা-বিরোধী আন্দোলন, নাগপুর, মাদ্রাজ এবং পটুয়াখালিতে নানাবিধ আন্দোলন কংগ্রেসের নীতি অনুসারে ও প্রতিষ্ঠানের নৈতিক সমর্থনে পরিচালিত হইতে থাকে।

 খিলাফৎকে উপলক্ষ করিয়া (‘খিলাফৎ’ দ্র) হিন্দু মুসলমানের যে ঐক্য আপাততঃ স্থাপিত হইয়াছিল, ঐ সময়ে ভারতের নানা স্থানে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে তাহা বিপর্যস্ত হইতে লাগিল। গান্ধীজী এবং কংগ্রেসের অপর নেতৃবৃন্দের চেষ্টা সত্ত্বেও ইহা স্পষ্টতর হইতে লাগিল যে ভারতের সর্বত্র বিক্ষিপ্ত, ভিন্নভাষা-ভাষী বিচ্ছিন্ন মুসলিম সমাজ ক্রমশঃ স্বীয় ধর্মানুগ সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য বর্ধিত করিয়া এক স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা প্রতিষ্ঠিত করিবার চেষ্টা করিতেছেন। কংগ্রেসের মধ্যে মধ্যবিত্ত এবং প্রগতিশীল লিবারেল অথবা বিপ্লবীদের যেমন শক্তি বৃদ্ধি পাইতে লাগিল, মুসলমান সমাজে তৎপরিবর্তে
অভিজাতগোষ্ঠীর এবং মধ্যযুগীয় মনোভাবের বৃদ্ধি পরি লক্ষিত হইতে লাগিল।

 অপর দিকে দেশে ট্রেড ইউনিয়নের প্রসারলাভ ঘটিতে লাগিল। বামপন্থী মতের প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হইল। কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের মধ্যে লালা লাজপৎ রায় ইহার সহিত সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দে জওহরলাল নেহরু মাদ্রাজে রিপাবলিকান কংগ্রেস নামক এক সম্মিলনে প্রস্তাব করেন যে, কংগ্রেসকে প্রগতিশীল মতবাদ স্বীকার করিয়া লইতে হইবে।

 ইতিমধ্যে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতৃবৃন্দের চেষ্টায় ১৯ মে ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দে এক সর্বদলীয় সভায় প্রস্তাব হয় যে ভবিষ্যৎ ভারতের গঠনতন্ত্র কেমন হইবে তাহা স্থিরীকৃত হওয়া প্রয়োজন। ঐ খ্রীষ্টাব্দেই মোতীলাল নেহরুর সভাপতিত্বে একটি রিপোর্ট প্রস্তুত হয় এবং তাহার আলোচনা প্রসঙ্গে দেশময় রাজনৈতিক আদর্শ সম্বন্ধে বহুবিধ মতামত প্রকাশিত হয় (‘নেহরু, মোতীলাল’ দ্র)।

 গান্ধীজীর সহিত কংগ্রেসের নেতৃবর্গের চিন্তায় ও কর্মে ব্যবধান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইলেও তিনি স্বীয় কর্মপন্থা কংগ্রেস প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় অনুসরণ করিয়া চলিলেন। ১৯২৪ খ্রীষ্টাব্দে বেলগাঁও কংগ্রেসের সভাপতিরূপে তিনি প্রস্তাব করেন যে, কংগ্রেসকে দেয় চাঁদা পয়সার পরিবর্তে সুতা কাটিয়া দেওয়া হউক। তাঁহার ইচ্ছা ছিল, দরিদ্রতম, অশিক্ষিত ভারতবাসীকেও এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় সদস্য করিয়া তুলিতে হইবে। কিন্তু উক্ত প্রস্তাব কার্যতঃ গৃহীত হয় নাই।

 দেশে বিপ্লবী শক্তির অভ্যুত্থানেরও উত্তরোত্তর প্রমাণ পাওয়া যাইতে লাগিল। এরূপ অবস্থায় ১৯২৯ খ্রীষ্টাব্দে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে নির্ধারিত হইল যে, অতঃপর পূর্ণ স্বাধীনতাই কংগ্রেসের রাজনৈতিক লক্ষ্য হইবে। সংকল্পকে কার্যে পরিণত করার জন্য গান্ধীজী ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে লবণ-সত্যাগ্রহের প্রবর্তন করেন। সমগ্র দেশ গভীরভাবে এই ডাকে সাড়া দিল। এক বৎসরের মত সত্যাগ্রহ চলিবার পর ব্রিটিশ গভর্নমেণ্টের আমন্ত্রণে আলোচনার নিমিত্ত গান্ধীজী কংগ্রেসের একক প্রতিনিধি হিসাবে বিলাতে যাত্রা করেন (‘গোল টেবিল বৈঠক’ দ্র)। তিনি ফিরিয়া আসিবার পর ১৯৩২ খ্রীষ্টাব্দের প্রারম্ভ হইতেই আইন অমান্য আন্দোলন তীব্র আকারে দেশময় ছড়াইয়া পড়িল (‘আইন অমান্য আন্দোলন’ দ্র)। ইতিমধ্যে ১৯৩১ খ্রীষ্টাব্দে কংগ্রেসের করাচি অধিবেশনে ভারতের রাজনৈতিক এবং সামাজিক আদর্শ সম্পর্কে কয়েকটি মৌলিক নীতি স্বীকৃত হয়।

১৩৫