বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/১৫৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
কংগ্রেস
কংগ্রেস

ইহাই পরবর্তী কালে ভারতের সংবিধান রচনার ভিত্তিস্বরূপ ব্যবহৃত হইয়াছিল।

 ১৯৩২ খ্রীষ্টাব্দের আইন অমান্য আন্দোলনের সময়ে কারারুদ্ধ হইবার পর ১৯৩৩ খ্রীষ্টাব্দের ৮ মে গান্ধীজী মুক্তিলাভ করিয়া পুনরায় গঠনকর্মে বিশেষভাবে আত্মনিয়োগ করিলেন। কার্যতঃ ৭ এপ্রিল ১৯৩৪ খ্রীষ্টাব্দে আইন অমান্য প্রত্যাহৃত হইল এবং সেই বৎসরই কংগ্রেসের অধিবেশনে গান্ধীজী কংগ্রেসের সভ্যপদ পরিহার করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সহিত কার্যতঃ তাঁহার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হইল না। তিনি নেতৃবৃন্দের পরামর্শদাতা রহিয়া গেলেন এবং শহরের পরিবর্তে গ্রামাঞ্চলে কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশন করিবার ব্যবস্থা করিলেন।

 ইতিমধ্যে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দে যে শাসনসংস্কার প্রবর্তিত করেন কংগ্রেস তাহা মানিয়া লইয়া অপরাপর রাজনৈতিক দলের সহিত নির্বাচনী দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয়। আইন অমান্য আন্দোলনের অবসানে যে অবসাদ দেখা গিয়াছিল, তাহা কাটিয়া গেল। ভারতের ১১টি প্রদেশের মধ্যে ৬টিতে এবং পরে আরও একটিতে কংগ্রেস প্রাদেশিক শাসনভার স্বীকার করিয়া লইল।

 শাসনভার গ্রহণ করার পর ভূমিসংস্কার, শিক্ষাবিস্তার, মাদকতাবর্জন প্রভৃতি বিষয়ে কার্যক্রম আরম্ভ হয়। দেশে যখন অর্থের অনটন রহিয়াছে, অথচ শিক্ষাবিস্তারের প্রয়োজন, তখন ইহা সম্ভব করিয়া তুলিবার জন্য গান্ধীজী বুনিয়াদি শিক্ষার প্রবর্তন করেন (‘বুনিয়াদি শিক্ষা’ দ্র)। প্রদেশে প্রদেশে কংগ্রেস সরকার ইহা যথাসাধ্য কার্যে পরিণত করার চেষ্টা করিতে লাগিল।

 ইতিমধ্যে দেশে কৃষক আন্দোলন এবং সামস্ত রাজগণের অধীন ওড়িশা, হায়দরাবাদ, কাঠিয়াওয়াড় প্রভৃতি বহু অঞ্চলে প্রজা-আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়াইয়া পড়িল। কংগ্রেসের সভ্যগণই ইহার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী হইলেও প্রতিষ্ঠান হিসাবে কংগ্রেস ইহার প্রত্যক্ষ দায়িত্ব গ্রহণ করে নাই।

 এই সময়ের অপর একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য: সুভাষচন্দ্র বসু যখন ১৯৩৮ খ্রীষ্টাব্দে হরিপুরা কংগ্রেসের সভাপতি তখন তাঁহার নির্দেশে জওহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে সমগ্র ভারতের জন্য একটি আর্থিক উন্নতিবিধানের পরিকল্পনা রচিত হয় (১৯৩৯ খ্রী)। উক্ত ন্যাশন্যাল প্ল্যানিং কমিশনের দ্বারা কয়েকটি মূল্যবান রিপোর্টও ক্রমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাহা কার্যে পরিণত হইবার পূর্বেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বাধিয়া যায়। ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দে উৎপাদন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের
যে নীতি গান্ধীজী প্রবর্তন করিয়াছিলেন, কংগ্রেস প্রবর্তিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় তাহা প্রায় আমূল পরিত্যক্ত হয়। অর্থাৎ ইহাকে গান্ধীজীর সহিত কংগ্রেস নেতৃবর্গের আদর্শগত ক্রমবর্ধমান প্রভেদের একটি প্রমাণ বলিয়া বিবেচনা করা যাইতে পারে।

 ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দের শেষে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আরম্ভ হইল। কংগ্রেস দ্বিধাগ্রস্ত হইলেন। নেহরু, আজাদ প্রভৃতি নেতৃবৃন্দের মধ্যে কেহ কেহ বিনা শর্তে ফ্যাসিস্ট শক্তিবৃন্দের বিরুদ্ধে বিশ্বযুদ্ধে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির সহায়তার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু গান্ধীজীর মত ছিল, বর্তমান যুদ্ধ সত্যসত্যই গণতন্ত্রের রক্ষার্থে পরিচালিত হইতেছে কিনা তাহা প্রথমে স্থিরীকৃত হওয়া প্রয়োজন। কতকটা গান্ধীজীর পরামর্শ উপেক্ষা করিয়া রাজাগোপালাচারীর পরামর্শে কংগ্রেস যুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার প্রস্তাব করে (জুলাই ১৯৪০ খ্রী)। ব্রিটিশ সরকার কিন্তু তাহাতে সাড়া দিলেন না।

 ইতিমধ্যে বিশ্বযুদ্ধ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করিল। সুদূর প্রাচ্যে জাপানের আঘাতে ইংরেজ নৌশক্তি এবং প্রশান্ত মহাসাগরে আমেরিকান নৌশক্তি বিপর্যস্ত হইল। ফলে ভারতের মধ্যে অসহায়তার বশে কোথাও কোথাও সন্তোষের ভাব দেখা গেল। গান্ধীজী ইহাতে প্রমাদগনিলেন; এবং ভাবিলেন, যদি ভারতবাসী কংগ্রেসের নেতৃত্বে আজ স্বীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার শেষ চেষ্টা না করে, এবং জাপানের জয়ে নিজে উৎফুল্ল হইয়া ওঠে, তবে এই আত্মাবমাননা এবং মানসিক অপঘাত হইতে ভারতবর্ষকে রক্ষা করা দুঃসাধ্য হইবে।

 জওহরলাল নেহরু, মওলানা আজাদ প্রমুখ যুদ্ধকালে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের স্বপক্ষে ছিলেন না। কিন্তু দেশে ক্রমবর্ধমান তামসিকতার প্রসারের যুক্তি দেখাইয়া গান্ধীজী অবশেষে ইহাদিগকেও সত্যাগ্রহ আন্দোলনের স্বপক্ষে রাজি করাইলেন। কংগ্রেস ইংরেজকে বলিল, ‘ভারত ছাড়’, এবং সমগ্র দেশবাসী আত্মবলে বলীয়ান হইয়া বলিল, ‘করিব না হয় মরিব’।

 ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের সূচনাতেই (আগস্ট ১৯৪২ খ্রী) কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ কারারুদ্ধ হইলেন। তৎসত্ত্বেও আন্দোলন বিপুল আকার ধারণ করিল। রাজনৈতিক দৃষ্টিতে আন্দোলন সফল না হইলেও দেশে যে কাপুরুষজনোচিত মনোভাব ব্রিটেনের বিপর্যয়ে উল্লাসের আকারে আত্মপ্রকাশ করিতেছিল, তাহা মুছিয়া গেল।

 কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের তিন বৎসর কারাবাসের পর ১৯৪৫ খ্রীষ্টাব্দে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হইলে ব্রিটিশ সরকার

১৩৬