ছিলেন। কবিগানের ক্রমবিলয় দেখিয়া তিনিই প্রাচীন কবিওয়ালাগণের জীবনী ও সংগীত সংগ্রহে উদ্যোগী হইয়াছিলেন। আধুনিক শিক্ষার প্রসার ও রুচি পরিবর্তনের ফলে অতঃপর হাফ-আখড়াইও সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হইল (‘আখড়াই’ ও ‘হাফ-আখড়াই’ দ্র)।
কবিগানের এই আকস্মিক সমাদর ও অনাদরের কারণ ছিল। সে সময়টা আদর্শপ্রণোদিত সাহিত্যসৃষ্টির যুগ ছিল না। বৈষ্ণব পদাবলী যেমন নির্দিষ্ট রচনাপদ্ধতি ও রসশাস্ত্রের অনুগামী হইয়াছিল, মঙ্গলকাব্যও তেমনই অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে একটি শিল্পসম্মত আদর্শ অর্জন করিতে সমর্থ হইয়াছিল। ভারতচন্দ্র প্রমুখ সেকালের শিক্ষিত কবি সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্র মানিয়া চলিয়াছেন। কিন্তু কবিওয়ালারা সাধারণতঃ সমাজের অশিক্ষিত অথবা অল্পশিক্ষিত স্তর হইতে উদ্ভুত বলিয়া উচ্চ সাহিত্যের কোনও শিক্ষা তাহারা পায় নাই। সাহিত্য হিসাবে অমার্জিত এই কবিগান কিছুকালও যে নাগরিক সমাজের মনোরঞ্জন করিয়াছিল তাহার কারণ খুঁজিতে হইবে সেকালের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে।
এককালে সাহিত্য রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করিয়াছিল। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর নানা রাজনৈতিক বিপর্যয়ে সাহিত্যসৃষ্টির সেই পরিবেশ লোপ পাইতে থাকে। মুর্শিদকুলি খাঁর আমলেই (১৭০১-২৭ খ্রী) পূর্বতন জমিদারদের সমৃদ্ধি ক্ষয় পাইতে আরম্ভ করে। ইহারাই ছিলেন সাহিত্যের উৎসাহী শ্রোতা ও আশ্রয়দাতা। অতঃপর পলাশির যুদ্ধের (১৭৫৭ খ্রী) পর বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার দিনে প্রাচীন আভিজাত্য ক্রমেই ধ্বংসের মুখে অগ্রসর হইতে থাকে। তাহার স্থানে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হইল এক নূতন ধরনের আভিজাত্য। ঈস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ও নবাবের দ্বৈত শাসনের সুযোগে চতুর ও কৌশলী ব্যক্তিগণ নানা উপায়ে বিত্ত অর্জন করিয়া এক নূতন নাগরিক সমাজের প্রতিষ্ঠা করিল। দেশ যখন মন্বন্তর ইত্যাদি নানা দুর্ভাগ্যে জর্জরিত তখন গঙ্গার তীরবর্তী হুগলি, চন্দননগর, কলিকাতা প্রভৃতি অঞ্চলে বিদেশী বণিকদের কুঠির আশেপাশে এই নূতন দেশীয় অভিজাত সমাজ গড়িয়া উঠিল। লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে আমাদের সুপরিচিত কবিওয়ালাগণ অধিকাংশই এই অঞ্চল হইতেই আবির্ভূত হইয়াছেন। ইহার অর্থ অবশ্য এই নয় যে বাংলা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কবিগান ছিল না। কিন্তু ইতিহাসের এক বিশেষ যুগে বণিকদের পৃষ্ঠপোষকতায় নাগরিক জীবনে কবিগানকে হঠাৎ প্রাধান্য পাইতে দেখিয়া বুঝিতে পারা যায় যে বাংলা দেশেরইহা হইতে বুঝিতে পারা যাইবে কবিগানে নিত্যকালীন সাহিত্যরসের অভাব ছিল। নূতন শ্রোতার দল সাহিত্যের কোনও সূক্ষ্মতা চাহিত না, কোনও নৈতিক আদর্শের ধার ধারিত না। ইহাদের তুষ্টিবিধানের জন্য অনুষ্ঠিত কবিগানে স্বভাবতঃই মানবমনের দুর্বল দিকগুলিই প্রতিফলিত হইয়াছে। আরও লক্ষ্য করিবার বিষয় এই যে সম্ভ্রান্ত শ্রোতার গৃহে যদি বা সখীসংবাদ ইত্যাদি অপেক্ষাকৃত মার্জিত রুচির গান হইত, অন্যত্র খেউড় গানেরই চল ছিল। এইভাবেই কবিওয়ালারা যেখানে যেমন প্রয়োজন তদনুযায়ী লোকরঞ্জন করিয়া অর্থোপার্জন করিত। বিশিষ্ট শিল্প রূপে কবিগানের বিকাশসাধন তাহাদের লক্ষ্য ছিল না।
কবিগানের অঙ্গ চারিটি: ভবানী-বিষয়, সখীসংবাদ, বিরহ এবং খেউড়। অবশ্য পরে আরও নানা বিষয় কবিগানে প্রবিষ্ট হয়। কিন্তু ইহার মূল রীতি ছিল এই-চারি বিষয়ের গান। ভবানী-বিষয়ের অন্য নাম ছিল—দেবী-বিষয়, ঠাকুরানী-বিষয় ইত্যাদি। কবিওয়ালা রাম বসুর সপ্তমী গান খুবই প্রসিদ্ধি অর্জন করিয়াছিল। কবিগানের মধ্যে আসলে ভবানী-বিষয়ই বিশুদ্ধ রুচিকে রক্ষা করিয়াছিল; তাহার কারণ, মেনকা ও উমার মধুর বাৎসল্যের সম্পর্কই ছিল ইহার উপজীব্য। ভবানী-বিষয় গাওয়া হইলে সখীসংবাদের অবতারণা হইত। ইহার বিষয়বস্তু বৈষ্ণব ধর্ম হইতে গৃহীত। রাধার কোনও দূতী মথুরায় গিয়া কৃষ্ণকে অনুরোধ অনুযোগ ক্রোধ ও ভর্ৎসনা করিতেছে—ইহাই সখীসংবাদের বিষয়। নিত্যানন্দ দাস ও হরু ঠাকুরের সখীসংবাদের বিশেষ খ্যাতি ছিল। নিত্যানন্দ নিজে গান বিশেষ রচনা করিতেন না। তাঁহার দলের নবাই ঠাকুর উৎকৃষ্ট সখীসংবাদ রচনা করিতেন। সখীসংবাদের পর বিরহ। বিরহগানের বিষয়বস্তু ছিল সম্পূর্ণ লৌকিক। কবিগানের মধ্যে রসের যেটুকু শ্রেষ্ঠতা ছিল তাহার স্ফুর্তি হইয়াছে বিরহগানে। রাম বসুর অনেক বিরহগান পরবর্তী কালেও প্রচলিত ছিল। কবিগানের সর্বশেষ অঙ্গ খেউড় বিরহের মতই ধর্মসম্পর্কশূন্য কিন্তু অত্যন্ত স্থূল এবং অধিকাংশ সময়েই অশ্লীল অশ্রাব্য১৬৬