বাক্য ও ইঙ্গিতে পূর্ণ। খেউড়ই নিকৃষ্টরূপে লহর নামে পরিচিত হইয়াছে। পূর্ব বঙ্গে এই গানকে লালগান বলে।
এই চারি অঙ্গের পদরচনার বিশেষত্বটুকু লক্ষণীয়। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত যে গান সংগ্রহ করিয়াছিলেন তাহাতে তিনি মহড়া, চিতেন ও অন্তরা এই তিনটি ভাগ মাত্র দেখাইয়াছেন। ইহার এক-একটি ভাগেও মিলের নিয়ম ছিল এবং তদনুসারে গানের পদাংশের বিশিষ্ট নামও ছিল। যেমন চিতেন-ক, পরচিতেন-ক, ফুকা-খ খ, মেলতা-গ, মহড়া-গ, শওয়ারি, খাদ-গ, দ্বিতীয় ফুকা-ঘ ঘ, দ্বিতীয় মেলতা-গ, অন্তরা। এখানে বর্ণদ্বারা নামের সঙ্গে সঙ্গে মিলের রীতি প্রদর্শিত হইল। হাফ-আখড়াইয়ের পূর্বে কবিগানের ইহাই ছিল রচনারীতি। এখানে উল্লেখযোগ্য, কবিগানের রচয়িতাদের মধ্যে কেহ মহড়া হইতে আরম্ভ করিতেন, কেহ বা আরম্ভ করিতেন চিতেন দিয়া, যদিও গাহিতে হয় সর্বদাই চিতেন দিয়া।
কবির গানের আসরে দুই দলকে আহ্বান করা হইত। প্রথম দল ভবানী-বিষয় গাহিয়া সখীসংবাদের অবতারণা করিত। এই প্রথম অবতারণার নাম চাপান। দ্বিতীয় দল সখীসংবাদের উত্তর গান গাহিত, তাহার নাম উতোর। এইভাবে বিরহে ও খেউড়েও চাপান-উতোর চলিত। ভবানী-বিষয় লইয়া কোনও প্রত্যুত্তর চলিত না। জয়নারায়ণ ঘোষালের ‘করুণানিধানবিলাস’ কাব্যে (আনুমানিক ১৮১৪ খ্রী) কবিগানের যে নিদর্শন আছে তাহাতে গুরুদেবের গীত দিয়া গান আরম্ভ হইতে দেখা যায়। সম্ভবতঃ আদিতে ভবানী-বিষয় বা গুরুদেবের গীত কবিগানের অপরিহার্য অঙ্গ ছিল না। অনেক ক্ষেত্রেই প্রতি কবির দলে এক বা একাধিক বাঁধনদার থাকিত। দলের সঙ্গে বসিয়া তাহারা গান রচনা করিয়া দিত। সেই গানই সঙ্গে সঙ্গে গাওয়া হইত। আসরশেষে যে দলের গাহনা উৎকৃষ্ট বিবেচিত হইত সেই দলই পুরস্কার লাভ করিত। পূর্বে উভয় দল একসঙ্গে বসিয়া চাপান ও উতোর স্থির করিয়া লইয়া নির্দিষ্ট দিনে আসরে নামিত। উপস্থিতমত চাপান ও উতোর রচনার রীতি প্রবর্তন করেন রাম বসু। নানা রহস্যকথায় শ্লেষে ব্যঙ্গে আক্রমণে প্রতি-আক্রমণে কবির গান যথেষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ হইয়া উঠিত। নিতে-ভবানীর (নিত্যানন্দ দাস ও ভবানী বণিক) লড়াই শুনিতে সুদূর গ্রামাঞ্চল হইতে নাকি লোক ভাঙিয়া পড়িত। হাফ-আখড়াই প্রবর্তিত হইবার পর পূর্বের গান পরিচিত হইল ‘দাঁড়াকবি’ বলিয়া। কবিওয়ালা রঘুনাথ দাসই নাকি দাঁড়াকবির প্রবর্তক। এই কিংবদন্তি সত্য হইলে রঘুনাথ দাসের পূর্বে কবিগানের রূপ-রীতি সরল ছিল বলিয়া মনে করা যাইতেদ্র গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত, প্রাচীন কবিসংগ্রহ, ১ম খণ্ড, কলিকাতা, ১২৮৪ বঙ্গাব্দ; মনোমোহন বসু, মনোমোহন গীতাবলী, কলিকাতা, ১২৯৩ বঙ্গাব্দ; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লোকসাহিত্য, কলিকাতা, ১৩৫২ বঙ্গাব্দ; ভবতোষ দত্ত সম্পাদিত, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত রচিত কবিজীবনী, কলিকাতা, ১৯৫৮; হরিপদ চক্রবর্তী, দাশরথি ও তাঁহার পাঁচালি, কলিকাতা, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ; S. K. De, History of Bengali Literature in the Nineteenth Century, Calcutta, 1919.
কবিগানের বাদ্য ও সুর সম্পর্কেও কিছু বলা প্রয়োজন। কবিগান ভারতীয় রাগসংগীতের আদর্শে সংগঠিত হয় নাই। বিশেষ কোনও রাগ অবলম্বনে এই গানগুলি গীত হইলেও তাহা মনোরঞ্জনের নিমিত্তই করা হইত। এই কারণেই কবিগানে সাধারণতঃ রাগাদির উল্লেখ দেখা যায় না। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের নির্দেশ হইতে জানা যায় যে প্রাচীন কবিগানের তিনটি অঙ্গ ছিল—চিতেন, মহড়া এবং অন্তরা। তিনি ইহাও বলিয়াছেন যে দাঁড়াকবি হাফ-আখড়াইয়ের ঢঙেও গাওয়া হইত। গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-সংকলিত ‘প্রাচীন কবিসংগ্রহ’ গ্রন্থ হইতে জানা যায় যে, হাফ-আখড়াইয়ের রীতিতে অনুষ্ঠিত দাঁড়াকবির বিন্যাস ছিল—চিতেন, পরচিতেন, ফুকা, মেলতা, মহড়া, শওয়ারি, খাদ, ফুকা, মেলতা ও অন্তরা। এইগুলির মধ্যে অন্তরা নামক কলিটি ভারতীয় রাগসংগীতে ব্যবহৃত কলি। প্রাচীন কবিগানের সহিত সংগত্ হিসাবে টিকারা (শানাইয়ের সহিত সংগতে ব্যবহৃত চর্মবাদ্য), কাড়া (কেট্ল ড্রাম) এবং জোড়ঘাই (ঢোলের সহিত যোজিত অপর একটি ক্ষুদ্র ঢোল) ব্যবহৃত হইত।
১৬৭