ঋগ্বেদ ভারতীয় আর্যগণের প্রাচীনতম সাহিত্যকৃতির নিদর্শন। ইহার রচনাকাল সম্বন্ধে পণ্ডিতগণের মধ্যে কোনও ঐকমত্য নাই। সমগ্র ঋক্সংহিতার সর্বপ্রথম সম্পাদক আচার্য মাক্স ম্যূলর বৈদিক যুগকে চারিটি সুনির্দিষ্ট স্তরে বিভক্ত করেন— ১. খ্রীষ্টপূর্ব ১২০০-১০০০ অব্দ পর্যন্ত ছান্দস যুগ; ২. খ্রীষ্টপূর্ব ১০০০-৮০০ অব্দ পর্যন্ত মন্ত্র যুগ; ৩. খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০-৬০০ অব্দ পর্যন্ত ব্রাহ্মণ যুগ; এবং ৪. খ্রীষ্টপূর্ব ৬০০-২০০ অব্দ পর্যন্ত সূত্র যুগ। ইহার মধ্যে প্রথম দুইটি স্তরের মধ্যেই সমগ্র ঋক্সংহিতার মন্ত্ররাজি ঋষিগণ কর্তৃক রচিত এবং সংকলিত হইয়াছিল। মাক্স ম্যূলরের এই সিদ্ধান্ত বহু পাশ্চাত্ত্য এবং ভারতীয় গবেষক মোটামুটি মানিয়া লইয়াছেন। কিন্তু কোনও কোনও পাশ্চাত্ত্য ভারততত্ত্ববিদ্ মনীষী উপরি-উক্ত স্তরবিন্যাস সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন। মার্টিন হাউগ্ তাঁহার সম্পাদিত ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণ’ গ্রন্থের ভূমিকায় আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ২৪০০-২০০০ অব্দ বৈদিক যুগের প্রাচীনতম স্তররূপে নির্দেশ করিয়াছেন। হের্মান য়াকোবি এবং গেওর্গ ব্যূলেরও মাক্স ম্যূলরের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন। এই সকল সমালোচনার ফলে মাক্স ম্যূলরও পরবর্তী কালে তাঁহার পূর্বমত পরিবর্তন করিয়াছিলেন।
১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দে বালগঙ্গাধর টিলক জ্যৌতিষিক গণনার সাহায্যে ঋগ্বেদের এবং অন্যান্য বৈদিক সাহিত্যের কাল- নির্ণয়ের এক অভিনব প্রচেষ্টা করেন। তিনি ‘অরিয়ন’ নামক তাঁহার সুপ্রসিদ্ধ গবেষণাপ্রবন্ধে ঋক্ -মন্ত্রসমূহের রচনাকাল যে আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দের ন্যূন হইতে পারে না, ইহা নানা সাক্ষ্য ও যুক্তির সাহায্যে প্রমাণ করিবার চেষ্টা করেন। পাশ্চাত্ত্য গবেষকগণ টিলকের এই সিদ্ধান্ত মানিয়া লইতে পারেন নাই। সাম্প্রতিক কালে প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করিয়া ঋগবেদের কাল- নির্ণয়ের প্রয়াস দেখা যাইতেছে। এই প্রসঙ্গে ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দে মধ্যপ্রাচ্যের বোঘাজ কোই নামক স্থানে জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ্ হুগো ভিঙ্ক্লের কর্তৃক হিত্তী ভাষায় লিখিত কয়েকটি মৃৎ-লেখের আবিষ্কারের উল্লেখ করা যাইতে পারে। পণ্ডিতগণ খ্রীষ্টপূর্ব ১৪০০ অব্দ এই মৃৎ-লেখের কাল বলিয়া সিদ্ধান্ত করিয়াছেন।বহির্ভারত হইতে আর্যগণের ভারত প্রবেশ এবং ঋগ্বেদের রচনাকাল খ্রীষ্টপূর্ব ১৪০০ অব্দের ঊর্ধ্বে হইতে পারে না, আধুনিক ঐতিহাসিকদের ইহাই সিদ্ধান্ত। মাক্স ম্যূলরের প্রাথমিক সিদ্ধান্তের সহিত ইহার মোটামুটি মিলও আছে।
‘ঋক্সংহিতা’ নামে যে সংকলন-গ্রন্থ বর্তমানে আমরা পাইয়া থাকি তাহাতে মোট সূক্তসংখ্যা হইল ১০১৭ (অথবা ১১টি ‘বালখিল্যসূক্ত’ লইয়া ১০২৮)। এই সূক্তগুলি ১০টি মণ্ডলে বিভক্ত; সেইজন্য ঋক্সংহিতার অপর এক সংজ্ঞা ‘দাশতয়ী’। এক একটি মণ্ডল আবার কয়েকটি অনুবাকে বিভক্ত। ঋগ্বেদের অপর এক বিভাগ অনুসারে সমগ্র সংহিতাটি আটটি অষ্টকে বিভক্ত। প্রতিটি অষ্টক আটটি বর্গ এবং প্রতি বর্গ পাঁচটি করিয়া মন্ত্র বা ঋক্ লইয়া গঠিত। কিন্তু মণ্ডল-বিভাগটিই প্রাচীন এবং যুক্তিসংগত। দশটি মণ্ডলের মধ্যে ২য় হইতে ৭ম মণ্ডল পর্যন্ত এক-একজন বিশেষ ঋষি এবং তাঁহার বংশধরগণ কর্তৃক পরিদৃষ্ট মন্ত্রের সংকলন। এই জন্য পাশ্চাত্ত্য গবেষকগণ এইগুলিকে ‘ফ্যামিলি বুক্স’ আখ্যায় অভিহিত করিয়া থাকেন। ৮ম মণ্ডলটি ‘প্রগাথ-মণ্ডল’ রূপে ও ৯ম মণ্ডল ‘পবমান-মণ্ডল’ রূপে পরিচিত। অবশিষ্ট ১ম এবং ১০ম এই দুইটি মণ্ডল অপেক্ষাকৃত পরবর্তী কালের সংযোজন বলিয়া পণ্ডিতগণের অভিমত। ২য় হইতে ৭ম পর্যন্ত ৬টি মণ্ডলের ঋষিগণের নাম যথাক্রমে গৃৎসমদ, বিশ্বামিত্র, বামদেব, অত্রি, ভরদ্বাজ এবং বশিষ্ঠ অথবা তাঁহাদের বংশধরগণ। অপর পক্ষে ১ম মণ্ডলের সূক্তগুলি একাধিক ঋষি কর্তৃক পরিদৃষ্ট; ৮ম মণ্ডলটি প্রধানতঃ কণ্বগোত্রীয় ঋষিগণ কর্তৃক দৃষ্ট ‘প্রগাথ’ মন্ত্রের সংকলন; ৯ম মণ্ডলে সংকলিত প্রত্যেকটি সূক্তের দেবতা ‘পবমান সোম’ অর্থাৎ যজ্ঞে সোমাভিষবকালে ওষধি সোমের উদ্দেশে যে সকল মন্ত্র পাঠ করা হইত সেই সব মন্ত্র এখানে একত্র সংগৃহীত হইয়াছে; এই সকল মন্ত্রের স্রষ্টা একগোত্র-সম্ভূত ঋষি নহেন; কেহ বৈশ্বামিত্র, কেহ কাণ্ব, কেহ কাশ্যপ, কেহ বা আঙ্গিরস ইত্যাদি; ১০ম মণ্ডলটিও বিভিন্ন গোত্রীয় ঋষিগণ কর্তৃক দৃষ্ট মন্ত্রের সংকলন। ১ম মণ্ডলের ঋষিগণ শতর্চি-সংজ্ঞক; ১০ম মণ্ডলের ঋষিগণ ‘ক্ষুদ্রসূক্ত’ এবং ‘মহাসূক্ত’ এই দুই সংজ্ঞায় অভিহিত; অব-