শিষ্ট মধ্যবর্তী ২য় হইতে ৯ম পর্যন্ত আটটি মণ্ডলের ঋষিগণ ‘মধ্যম’রূপে পরিচিত। আধুনিক গবেষকগণের মতে ২য় হইতে ৯ম মণ্ডল পর্যন্ত ঋক্সংহিতার এই মধ্যবর্তী ভাগটিই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন; অপর পক্ষে ১ম এবং ১০ম এই দুইটি মণ্ডলের সূক্তসমূহ অপেক্ষাকৃত পরবর্তী কালের সংকলন। লক্ষ্য করিবার বিষয় যে ১ম এবং ১০ম মণ্ডলের সুক্তসংখ্যা ও হুবহু একরূপ—প্রত্যেকটিতেই ১৯১টি করিয়া সূক্ত আছে। ২য় মণ্ডলে ৪৩টি; ৩য় মণ্ডলে ৬২টি; ৪র্থ মণ্ডলে ৫৮টি; ৫ম মণ্ডলে ৮৭টি; ৬ষ্ঠ মণ্ডলে ৭৫টি; ৭ম মণ্ডলে ১০৪টি; ৮ম মণ্ডলে ৯২টি এবং ৯ম মণ্ডলে ১১৪টি সূক্ত বর্তমান। এইভাবে মোট সূক্তসংখ্যা দাঁড়ায় ১০১৭। বর্তমানে যে ‘ঋক্সংহিতা’ প্রচলিত তাহাতে ১০১৭টি সূক্তই আছে। সংহিতাটি ‘শাকল’ শাখার অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে ‘ঋক্সংহিতা’র শাকল শাখার বিভিন্ন সংস্করণে ৮ম মণ্ডলের অন্তর্গত ১১টি সূক্ত (৮.৪৯-৫৯ সূক্ত) ‘বালখিল্য-সূক্ত’ নামে পরিচিত। এইগুলি সম্ভবতঃ ঋগ্বেদের অপর এক শাখার ‘সংহিতা’ হইতে সংগৃহীত।
ঋগ্বেদের খিল বা পরিশিষ্ট রূপে আরও কয়েকটি সূক্ত পাওয়া যায়। মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁহার ‘মহাভাষ্যে’র ‘সস্পশা’ আহ্নিকে স্পষ্টতঃই উল্লেখ করিয়াছেন যে 'বহবৃচ’গণের মধ্যে একুশটি শাখা প্রচলিত ছিল— (‘একবিংশতিধা বাহবৃচ...’)। শাকল শাখা ভিন্ন অবশিষ্ট শাখাগুলি নিশ্চয়ই কালক্রমে লোপপ্রাপ্ত হইয়াছে। হয়ত প্রত্যেক শাখারই বিভিন্ন সংহিতাগ্রন্থ ছিল এবং বিভিন্ন শাখাতে বহু নূতন সূক্তও হয়ত সংকলিত হইয়াছিল।
‘ঋক্সংহিতা’র উক্ত ১০টি মণ্ডলে সূক্তবিন্যাসের মধ্যেও কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসৃত হইয়াছে। প্রধানতঃ দেবতা, ছন্দঃ এবং সূক্তের অন্তর্গত ঋক্সংখ্যার উপর ভিত্তি করিয়া ২য় হইতে ৭ম পর্যন্ত ৬টি মণ্ডলে সূক্তগুলি ক্রমিকভাবে সাজানো হইয়াছে। দেখা যায়, এই কয়টি মণ্ডলে সর্বপ্রথমে অগ্নিদেবতা, তাহার অব্যবহিত পরেই ইন্দ্রদেবতার উদ্দেশে উচ্চারিত সূক্তগুলি বিন্যস্ত। তাহার পর ‘বিশ্বেদেবাঃ’, ‘মরুৎ’ প্রভৃতি দেবতাগণের উদ্দেশে সূক্তগুলির স্থান। এক একটি দেবতার উদ্দেশে নির্দিষ্ট সূক্তগুলির বিন্যাসের মধ্যেও একটি ক্রম আছে―প্রত্যেকটি পরবর্তী সূক্ত অব্যবহিত পূর্ববর্তী সূক্ত অপেক্ষা অল্পসংখ্যক ঋক্বিশিষ্ট। ৮ম মণ্ডলে কিন্তু সূক্তবিন্যাসে বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসৃত। ইহাতে এক একজন ঋষির যতগুলি সূক্ত আছে সবগুলি একত্র করিয়া বিভিন্ন দেবতা অনুসারে সূক্তগুলিকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে এমনভাবে যে প্রত্যেকটি দেবতার উদ্দেশে সংকলিত সূক্তগুলির মধ্যেঋগ্বেদের অন্যান্য শাখা কালক্রমে লুপ্ত হইলেও শাকল শাখার সংহিতা যে রক্ষিত হইয়াছে ইহার কারণ মহর্ষি শৌনক তাঁহার ‘ঋক্প্রাতিশাখ্য’তে ঋগ্বেদের সূক্তগুলির বর্ণ, স্বর এবং ব্যাকরণ-গত বৈশিষ্ট্য এমন পুঙ্খামুপুঙ্খরূপে বর্ণনা করিয়াছেন যে, পরবর্তী কালে কোনও অবাঞ্ছিত অনধিকারপ্রবেশ অথবা অবক্ষয় ঋক্সংহিতাকে বিকলাঙ্গ করিতে পারে নাই।
মহর্ষি শাকল্যের ‘পদপাঠ’ বৈয়াকরণ পদ্ধতি অবলম্বনে ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলির স্বতন্ত্র পদরূপে বিশ্লেষণের সর্বপ্রথম প্রয়াস। ঋক্-মন্ত্রসমূহের যথাযথ অর্থবিষয়ে বহু সন্দেহ এই পদপাঠের সাহায্যে নিরাকৃত হইয়াছে। এতদ্ভিন্ন ক্রম, জটা, মালা, শিখা, রেখা, ধ্বজ, দ্বন্দ্ব, রথ এবং ঘন প্রভৃতি বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনে এক একটি মন্ত্রকে পাঠ করিয়া তাহার বিশুদ্ধি সংরক্ষণের জন্য পূর্বাচার্যগণ অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়াছেন।
ঋক্সংহিতার প্রাচীনতম স্তরের (অর্থাৎ ২য় হইতে ৭ম মণ্ডল) ভাষাগত বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করিবার মত। এমন অনেক পদ [বিশেষতঃ ‘নাম’ (বিশেষ্য পদ) এবং ‘আখ্যাত’ (ক্রিয়া পদ)] এই সকল সূক্তে দেখিতে পাওয়া যায়, যেগুলি পরবর্তী সংস্কৃত ভাষাতে সম্পূর্ণভাবে অপ্রচলিত হইয়াছে অথবা তাহাদের মূল আদিম অর্থ পরিবর্তন করিয়াছে। এমন কি, মহর্ষি যাঙ্কের সময়ে এবং তাহার বহু পূর্ব হইতেই যে ঋক্-মন্ত্রগুলির প্রকৃত অর্থ সম্বন্ধে অধ্যেতৃ-সম্প্রদায়ের মনে নানারূপ সন্দেহের উদয় হইতেছিল তাহার অজস্র সাক্ষ্য তাঁহার ‘নিরুক্ত’ গ্রন্থে ইতস্ততঃ বিকীর্ণ হইয়া আছে। ‘নিঘণ্টু’ গ্রন্থের প্রথম দুইটি কাণ্ডে (যথাক্রমে ‘নৈঘণ্টু ক’ এবং ‘ঐকপাদিক’ বা ‘নৈগম’) যে সকল বৈদিক শব্দ সংগৃহীত হইয়াছে, তাহার অধিকাংশই পরবর্তীকালে অপ্রচলিত বা অর্থাস্তরে প্রযুক্ত হইয়াছে। মহর্ষি যাস্ক নির্বচনের (এটিমোলজি) সাহায্যে অতি দুরূহ বৈদিক শব্দগুলির অর্থ আবিষ্কার করিবার যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছেন। তবে সব সময় তাহা সস্তোষজনক হয় নাই। আধুনিক কালে তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান আলোচনার প্রসারের ফলে বৈদিক সংস্কৃতের সহিত প্রাচীন ইরানীয় বা২