বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/২২৮

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
কলিকাতা
কলিকাতা

সংযুক্তির ফলেই বর্তমান পৌর-কলিকাতার উদ্ভব সম্ভব হইয়াছে।

 ১৪৯৫ খ্রীষ্টাব্দে রচিত বিপ্রদাস পিপিলাই লিখিত ‘মনসাবিজয়’ নামক কাব্যে কলিকাতার প্রথম নির্ভরযোগ্য উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে ইহাকে হুগলি নদীর পূর্ব তীরস্থ গ্রাম বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে, ইহার উত্তরে ও দক্ষিণে দুই তীর্থক্ষেত্র—চিৎপুর এবং কালীঘাট।

 হুগলির নিম্ন অববাহিকার এই অঞ্চলে পর্তুগীজ নাবিকদের আনাগোনা শুরু হয় ১৫৩০ খ্রীষ্টাব্দ হইতে অর্থাৎ আলবুকের্ক-এর গোয়া-বিজয়ের প্রায় ২০ বৎসর পরে। তাহাদের বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল হুগলির কয়েক মাইল উত্তর-পশ্চিমে সরস্বতীর উপকূলবর্তী সপ্তগ্রাম। সপ্তগ্রাম ছিল তখনকার দিনে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়কেন্দ্র। কিন্তু সরস্বতী যথেষ্ট গভীর নয় বলিয়া পর্তুগীজরা সাধারণতঃ গার্ডেন রীচে জাহাজ নোঙর করিয়া ছোট ছোট নৌকাযোগে সপ্তগ্রামে মাল প্রেরণ করিত। এইভাবে হুগলি নদীর পশ্চিম তীরে, হুগলি সরস্বতীর সংগমস্থল বেতর-এ একটি অস্থায়ী বাণিজ্যিক উপনিবেশ গড়িয়া উঠিল। কিন্তু কালক্রমে সরস্বতীগর্ভে অত্যধিক পললসঞ্চয়ের ফলে এবং সম্রাট আকবরের সম্মতিক্রমে হুগলিতে পর্তুগীজ কুঠি নির্মাণের পর সপ্তগ্রাম ও বেতরের বাণিজ্য ধীরে ধীরে লোপ পায়; ইহার অধিবাসীরাও পুরাতন আবাসস্থল ত্যাগ করিয়া হুগলি নদীর পূর্বাঞ্চলে অপেক্ষাকৃত নিম্ন অববাহিকায় উঠিয়া আসে।

 সপ্তগ্রামের সমৃদ্ধিশালী গোষ্ঠীর মধ্যে বসাক ও শেঠ উপাধিধারী চারটি তন্তুবায় পরিবার ছিল অন্যতম। তাহারা আদি নিবাস ত্যাগ করিয়া হুগলির দক্ষিণে চারিদিকের জঙ্গলের মধ্যে একটি অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার জায়গায় গোবিন্দপুর নামে এক নূতন গ্রামের পত্তন করিল এবং অপর কয়েকটি তন্তুবায় পরিবারকে আহ্বান করিয়া সেখানে এক বৃহৎ উপনিবেশ গড়িয়া তুলিল। এই গ্রাম গার্ডেন রীচের সমীপবর্তী বলিয়া পর্তুগীজদের সঙ্গে বাণিজ্যের সুযোগও বর্ধিত হইল। কালক্রমে এই বসাক ও শেঠদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই গড়িয়া ওঠে কলিকাতার উত্তরে সুতানুটি হাট নামে এক বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র।

 যে তিনজন হিন্দু জমিদার এই সময়ে বাংলা দেশে বিখ্যাত ছিলেন তাহাদের মধ্যে সাবর্ণ চৌধুরীর পূর্বপুরুষ লক্ষ্মীকান্ত অন্যতম এবং তিনিই ছিলেন কলিকাতা ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের মালিক।

 ইতিমধ্যে ইংরেজ বণিকরাও ভারতবর্ষে আসিয়া পূর্ব
উপকূলের বালেশ্বরে কুঠি স্থাপন করিয়াছে। ১৬৫৮ খ্রীষ্টাব্দে জোব চার্নকের নেতৃত্বে তাহারা হুগলিতেও কুঠি স্থাপন করিল। কিন্তু ১৬৮৬ খ্রীষ্টাব্দে নবাবের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধের ফলে চার্নক হুগলি ত্যাগ করিতে বাধ্য হন এবং নদীপথে সুতানুটিতে উপস্থিত হন। সুতানুটির সমৃদ্ধি তাঁহাকে আকৃষ্ট করে। কিছুকাল মাদ্রাজে অবস্থানের পর নবাবের আহ্বানে ইংরেজরা পুনরায় তাঁহার নেতৃত্বে সুতানুটিতে ফিরিয়া আসিল। এইভাবে ভবিষ্যতের কলিকাতা শহরের ভিত্তি স্থাপিত হইল।

 নানা কারণে ইংরেজরা এই অঞ্চলকে কুঠি স্থাপনের জন্য আদর্শ স্থান বলিয়া নির্বাচন করিয়াছিল। প্রথমতঃ হুগলি নদীকে সমগ্র গাঙ্গেয় উপত্যকার বাণিজ্যপথ হিসাবে ব্যবহার করা যাইবে; দ্বিতীয়তঃ সুতানুটি, কলিকাতা ও গোবিন্দপুর—এই তিনটি গ্রামই সমুদ্রগামী জাহাজের পক্ষে উপযুক্ত নাব্য নদীখাতের উপরে অবস্থিত এবং তদুপরি এই অঞ্চল স্বদেশী বণিক ও শিল্পী-সমবায়ে ইতিমধ্যেই এক সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্ররূপে গড়িয়া উঠিয়াছে। সর্বোপরি নিরাপত্তার দিক দিয়াও এই অঞ্চলের অবস্থান ছিল আদর্শ বাণিজ্যকেন্দ্রের উপযোগী: উত্তরে চিৎপুরের খাঁড়ি, দক্ষিণে আদিগঙ্গা, পূর্বে লবণ-হ্রদ ও পশ্চিমে হুগলি নদীর দ্বারা পরিবেষ্টিত এই অঞ্চল প্রাকৃতিক কারণেই সুরক্ষিত ছিল।

 ১৬৯৬ খ্রীষ্টাব্দে বর্ধমানের জমিদার শোভা সিং-এর বিদ্রোহ যখন ভীষণ আকার ধারণ করে তখন ইংরেজরা তাহাদের কুঠিকে সুরক্ষিত করিবার জন্য নবাবের নিকট দুর্গ নির্মাণের অনুমতি প্রার্থনা করিল। নবাবের অনুমতিক্রমে ১৬৯৮ খ্রীষ্টাব্দে ঈস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি মাত্র ১৩০০ টাকায় জমিদার সাবর্ণ চৌধুরীদের নিকট হইতে সুতানুটি, গোবিন্দপুর এবং কলিকাতা গ্রাম তিনটি কিনিয়া লইয়া দুর্গ নির্মাণ করিতে আরম্ভ করে। ১৭০২ খ্রীষ্টাব্দে দুর্গ নির্মাণ শেষ হয়। এই পুরাতন ফোর্ট উইলিয়ামের বিস্তার ছিল উত্তরে বর্তমান ফেয়ারলি প্লেস হইতে আরম্ভ করিয়া দক্ষিণে কয়লাঘাট স্ট্রীট এবং পূর্বে ড্যালহৌসি স্কোয়্যার হইতে পশ্চিমে হুগলি নদী পর্যন্ত। দুর্গ নির্মাণের সময় হইতেই নগর পত্তনের শুরু। কিছুদিনের মধ্যেই জেটি এবং ব্যারাক, হাসপাতাল ও গির্জা গড়িয়া উঠিল; এবং ১৭০৭ খ্রীষ্টাব্দে ঈস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি কলিকাতাকে একটি স্বতন্ত্র প্রেসিডেন্সি বলিয়া ঘোষণা করিল।

 ১৭৪২ খ্রীষ্টাব্দে মারাঠা আক্রমণের সময়, ইংরেজরা নগররক্ষার জন্য বর্তমানের সার্কুলার রোড বরাবর এক পরিখা খনন করে; ইহাই ‘মারাঠা ডিচ’ নামে পরিচিত
 ভা ২॥২৭
২০৯