সংযোগ রক্ষা করিতেছে: একটি হাওড়া হইতে হুগলির পশ্চিম পার্শ্বস্থ ভারতবর্ষের বৃহত্তর অংশের সঙ্গে ও অপরটি শিয়ালদহ হইতে আসাম ও পশ্চিম বঙ্গের অন্যান্য জেলাগুলির সঙ্গে। কলিকাতার দুইটি প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র বড়বাজার ও ড্যালহৌসি স্কোয়্যার হাওড়া-পুল দ্বারা হুগলির অন্য পাড়ের সঙ্গে সংযুক্ত। শহরের উত্তর প্রান্তে হুগলি নদীর উপর অপর যে সেতুটি আছে তাহার নাম বিবেকানন্দ সেতু। সার্কুলার ক্যান্যাল ও বেলেঘাটা খাল শহরকে বেষ্টন করিয়া আছে এবং ইহার দ্বারা তীরবর্তী মিলগুলি হইতে নদীপথে মাল চলাচলের বিশেষ সুবিধা হয়। কলিকাতার রাজভবন হইতে ১৯ কিলোমিটার দূরবর্তী দমদম একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর; পৃথিবীর প্রায় সমস্ত প্রধান বিমানপথের সহিত দমদমের যোগ আছে। ভারতের প্রধান প্রধান শহরগুলির সঙ্গে বিমান-সংযোগের কেন্দ্রও দমদম।
পূর্বকালে কলিকাতার ব্যবহার্য পথের মধ্যে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত চিৎপুর হইতে কালীঘাট পর্যন্ত রাস্তাটিই ছিল প্রধান। ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত কলিকাতায় মাত্র দুইটি বাঁধানো রাজপথ ছিল। ১৯৬১ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতার মোট ৮০০ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ৭৯৩ কিলোমিটারই ছিল বাঁধানো রাজপথ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাংলা দেশের জেলাগুলিতে কৃষির অবনতি দেখা দেয় এবং ব্রিটিশ পণ্য-উৎপাদকের সহিত প্রতিযোগিতায় অনেক গ্রাম্য কারিগর ও শিল্পীর বৃত্তিনাশ ঘটে। সুতরাং স্বভাবতঃই বাংলা দেশের গ্রাম ও মফস্বল শহরের মানুষ কলিকাতায় আসিয়া মহানগরীর জনসংখ্যা স্ফীত করিতে থাকে। রেলপথও বাংলা দেশের বাহির হইতে বিপুল সংখ্যায় শ্রমিক আমদানিতে সহায়তা করে। ইহারা শহরের জনসংখ্যার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় শিল্পাঞ্চলের জনাকীর্ণ বস্তিগুলির ভিড় আরও বাড়িয়া উঠিল। ১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতার জনসংখ্যা ছিল ৬১১৭৮৪ এবং ইহা বর্ধিত হইয়া ১৯০১ খ্রীষ্টাব্দে দাঁড়ায় ৮৪৭৭৯৬। পরবর্তী ৫০ বৎসরে কলিকাতার জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় প্রায় ১৭৬% হারে; কিন্তু ১৯৫১-৬১ খ্রীষ্টাব্দে এই হার মাত্র ১৯%।
কলিকাতায় লোকবসতির ঘনত্ব সর্বত্র সমান নয়। জনবসতির ঘনত্ব বড়বাজারে সর্বাধিক, ইহাই কলিকাতার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে প্রতি একরে প্রায় ৮৮৯ জন লোক বাস করে। নারী-পুরুষের অসম অনুপাত কলিকাতার জনসমষ্টির আর একটি বৈশিষ্ট্য। ১৯৬১ সালের জনগণনা অনুসারে প্রতি ১০০ জন পুরুষের অনুপাতে নারীর সংখ্যাভাষা অনুযায়ী কলিকাতার জনসংখ্যার হার নিম্নরূপ:
| বাংলা | ৫০.৭% |
| হিন্দুস্থানী | ৩৪.৭% |
| ওড়িয়া | ৩.৩ |
| দক্ষিণভারতীয় | ০.৬% |
| অন্যান্য ভারতীয় | ৮.৪% |
| ইংরেজী | ১.৬% |
| অন্যান্য অভারতীয় | ০.৭% |
বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায় ও ভাষাগোষ্ঠীর লোক সাধারণতঃ কলিকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করে। বাঙালী হিন্দু প্রধানতঃ প্রাচীন সুতানুটি, কলিকাতা এবং কালীঘাট অঞ্চলে বাস করে। অবাঙালী হিন্দুদের প্রধান বাস বড়বাজারে। দক্ষিণভারতীয় ও শিখদের প্রধানতঃ বালিগঞ্জ ও ভবানীপুর অঞ্চলে বাস করিতে দেখা যায়। ওড়িশা, বিহার ও উত্তর প্রদেশের লোকেরা সাধারণতঃ শ্রমিকবৃত্তিধারী এবং শহরের প্রান্তে অথবা খিদিরপুরের ডক এলাকায় বাস করে। শহরের মুসলমানেরা প্রধানতঃ তিনটি এলাকায় বাস করে, রাজাবাজার, পার্ক সার্কাস ও এণ্টালি।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় হইতে এবং ইংরেজ বণিকদের চাপে অনেক বাঙালী ক্রমে ক্রমে বাণিজ্যবৃত্তি বর্জন করে। তাহাদের নিকট আমলাতন্ত্রের বা অন্যবিধ চাকুরির আকর্ষণ বাড়িতে থাকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে যখন রাজনৈতিক মুক্তি-আন্দোলনের বিক্ষোভে বাংলা দেশ, বিশেষতঃ কলিকাতা, অগ্রণী হইয়া উঠিল তখন ব্রিটিশ বণিক ও শাসকেরা তাহাদের অধীন বাঙালী কর্মচারীদের ধীরে ধীরে সরাইয়া দিতে চেষ্টা করে; ফলে কলিকাতার অর্থনৈতিক জীবনে যে শূন্যস্থানের সৃষ্টি হইল, রাজস্থানী ও অন্যান্য অবাঙালী বণিকগোষ্ঠীগুলি তাহা পূরণ করিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী কালে এই নুতন বণিক-সম্প্রদায় কলিকাতাকেই স্বীয় বাসস্থানে পরিণত করিয়াছে, পূর্বে তাহা করিত না। বর্তমানে এই সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিরা শিল্পে ও বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রবেশ করিয়াছে এবং বিদায়ী ব্রিটিশদের নিকট হইতে শিল্প এবং ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানগুলি ক্রয় করিয়া লইতেছে। যেখানেই পুরাতন বাঙালী পল্লী পুনর্গঠিত২১১