ইংল্যাণ্ড আমেরিকার ন্যায় সাবেক ধনতন্ত্রের দেশে একচেটিয়া বিকাশের শুরু হইয়াছিল। বিবিধ আইনের সাহায্যে ঐসব দেশে একচেটিয়া ব্যবসায়ের ক্ষমতা খর্ব করিবার চেষ্টা হইয়াছে। কিন্তু ধনতন্ত্রের পরিণত পর্যায়ে এখন ঐসব দেশের আর্থিক কাঠামোয় বিরাট বিরাট একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানের প্রভাব-প্রতিপত্তি অন্তহীন। আবার জার্মানি বা জাপানের মত দেশে বিলম্বিত ধনতন্ত্রের বিকাশ সূচনা হইতেই বহুলাংশে একচেটিয়া গতিপ্রকৃতি পরিগ্রহ করিয়াছিল। তাহা ছাড়া শিল্পযোজনার ঘাটতি দ্রুত হারে দূরীকরণের উদ্দেশ্যে বিলম্বিত ধনতন্ত্রের দেশগুলিতে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় একচেটিয়া সংগঠন গড়িয়া উঠিতে দেখা গিয়াছে। এইরূপ সংগঠনের মালিকানা ও পরিচালনায় রাষ্ট্রের অংশ থাকে। রাষ্ট্রের আনুকূল্যেই তাহারা বিকাশ লাভ করে। এইরূপ ব্যবস্থা রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট একচেটিয়া ধনতন্ত্র (স্টেট মনোপলি ক্যাপিট্যালিজ্ম) আখ্যায় পরিচিত। দুই বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবেক ধনতন্ত্রের দেশেও রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট একচেটিয়া ধনতন্ত্রের দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে। প্রধানতঃ অল্প কয়েকজনের প্রতিযোগিতা (অলিগোপলি) হইতে উদ্ভুত অনিশ্চয়তা ও অস্থায়িত্ব দূর করিবার উদ্দেশ্যেই শেষোক্ত দেশগুলিতে বাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে একচেটিয়া স্বার্থের সংহতি ঘটিয়াছে। আবার অর্থনৈতিক বিকাশের দিক দিয়া অনগ্রসর দেশগুলিতে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত মূলধনের সহযোগিতায় সৃষ্ট একচেটিয়া সংগঠনের পরিচালনায় শিল্পযোজনার নানাবিধ প্রচেষ্টা সাম্প্রতিক ইতিহাসের আর একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার।
প্রতিযোগী হইতে একচেটিয়া অবস্থায় বিবর্তনের যে ধারার কথা পূর্বে লিখিত হইল ঔপনিবেশিক অর্থনীতির কাঠামোয় বিধৃত ভারতীয় ধনতন্ত্রের বিশিষ্ট ইতিহাসে ঐরূপ পর্যায়ক্রম পূর্ণ সংগতি লাভ করে নাই। সামন্ততান্ত্রিক প্রভুত্বের কবলমুক্ত কৃষক-কারিগরের স্বাধীন জীবিকার সংকল্প এবং তাহার সামাজিক স্বীকৃতির ভিত্তিতেই ধনতন্ত্রের সাবেক জন্মভূমিসমূহে ঐ আর্থব্যবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ের সূচনা হইয়াছিল। ভারতে ধনতন্ত্রের ইংরেজ বিজয় ঘটিত আদি সংঘাতে মধ্যস্বত্বভোগী ভূমিব্যবস্থার প্রবর্তনা ও দেশজ শিল্পের ধ্বংসলীলায় কৃষক-কারিগরের সংস্থান ও সাংগঠনিক উদ্যম বিনষ্ট হইয়া যায়। তারপর বণিকবৃত্তি এবং আর্থিক (ফিনান্শিয়্যাল) স্বার্থের কর্তৃত্ববিশিষ্ট যে ম্যানেজিং এজেন্সি ব্যবস্থার পরিচালনায় ভারতে ধনতন্ত্রের বিকাশ মুখ্যতঃ সাধিত হইয়াছে তাহার বিশেষ প্রণালীতে এ দেশে ধনতন্ত্র প্রথম হইতেই খানিকটা একধনতন্ত্রের স্বাভাবিক বিবর্তনের ধারায় সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতা হইতে একচেটিয়া অবস্থায় পরিণতি ঘটিলে তাহার পূর্ববর্তী অধ্যায়টি উৎপাদন ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক উন্নতিতে সম্পৃক্ত থাকে। প্রতিযোগী পর্যায়ে উৎপাদন কৌশলের উন্নতি ও মুনাফাবৃদ্ধির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অনুরূপ বিকাশের অনুকুল। সোজাসুজি পাশাপাশি বা ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ায় যন্ত্রনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় নানাবিধ সংহতি ও উন্নয়নের কথা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করিয়াছি। কিন্তু ভারতে একচেটিয়া বিকাশের বিশেষ ধারায় উৎপাদন কৌশলের উন্নতি এবং ব্যবসায়ের আয়তন বৃদ্ধির মধ্যে অনুরূপ যোগাযোগের দৃষ্টান্ত বিরল। বিভিন্ন ম্যানেজিং এজেন্সির আয়ত্তে উৎপাদনের দিক হইতে সম্পর্কবিহীন নানাবিধ শিল্প ও ব্যবসায়ের যে সমাবেশ দেখা যায় তাহাতে কোনও উন্নতিমূলক সম্প্রসারণের কর্মধারা সাধিত হইয়াছে বলা যায় না। তাই অকিঞ্চিৎকর শিল্পজ উৎপাদনের বনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত একচেটিয়া ধনতন্ত্রের কুফলগুলি ভারতীয় অর্থনীতিতে পুরাপুরি বর্তাইয়াছে, কিন্তু একচেটিয়া ধনতন্ত্রে পরিণতির পক্ষে যথাযথ যন্ত্রশিল্পের পূর্ববর্তী বিকাশ সাধিত হয় নাই। ধনতন্ত্রের এই অনিয়মিত গতিপ্রকৃতিতে আধুনিক ভারতীয় অর্থনীতির একটি মূল দ্বন্দ্ব ও সমস্যার পরিচয় পাওয়া যায়।
বিবিধ তথ্য হইতে ভারতে একচেটিয়া ব্যবসায়ের প্রতিপত্তি ও ইদানীন্তন অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়। একই ম্যানেজিং এজেন্সির পরিচালনায় একাধিক বিরাট কারখানা ও ব্যবসায়ের সমাবেশ ঘটিবার ফলে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক প্রসার ঘটিয়াছিল। ১৯৫৬ খ্রীষ্টাব্দে একটি আইনের দ্বারা ভারত সরকার ম্যানেজিং এজেন্সিগুলির কর্মক্ষেত্রের পরিসর ও আয় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করিয়াছেন। কিন্তু