বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/৩৯

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
একনায়কতন্ত্র
একনায়কতন্ত্র

একনায়কতন্ত্র শব্দটি বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। বর্তমানে একনায়কতন্ত্র বলিতে সাধারণতঃ এমন এক শাসনব্যবস্থা বুঝায় যেখানে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিংবা নিয়মতন্ত্রবহির্ভূতভাবে নিরঙ্কুশ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অধিকার বা ব্যবহার করা হয়। যদি কোনও রাষ্ট্রের রাজা, রাষ্ট্রপতি বা প্রধান মন্ত্রী একনায়কতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অধিকার বা ব্যবহার করেন, তাঁহাকেও একনায়ক বলা হয়। যে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জনসাধারণের নিকট তাহার কৃতকর্মের জন্য দায়ী থাকে না, তাহার স্বরূপ হয় সর্বাত্মক (টোটালিটারিয়ান) এবং কার্যক্রম একনায়কতান্ত্রিক। একনায়কতন্ত্রের সংজ্ঞা নিরূপিত হওয়া উচিত সরকারের কার্যক্রম দ্বারা, গঠনের দ্বারা নহে।

 প্রজাতন্ত্রী রোমে একনায়কতন্ত্র ছিল সংবিধানসম্মত সাময়িক সংকটকালীন শাসনব্যবস্থা মাত্র। বহিরাক্রমণ, গৃহবিবাদ প্রভৃতি কারণে সাধারণ শাসনপদ্ধতি স্থগিত রাখিয়া কোনও এক ব্যক্তির হস্তে শাসনক্ষমতা ন্যস্ত করিবার ব্যবস্থা ছিল। সংকটাবস্থার অবসানের সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু একনায়কতন্ত্রের অবসান হইত এবং সাধারণ শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হইত। একনায়ককে তাঁহার শাসনকালীন কর্মের ব্যাখ্যা দিতে হইত। সুল্লা (খ্রীষ্টপূর্ব ৮২ অব্দ) ও জুলিয়াস সিজার (খ্রীষ্টপূর্ব ৪৫ অব্দ) এই প্রথা অগ্রাহ্য করিয়া অনির্দিষ্ট কালের জন্য দায়িত্বহীন একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁহাদের শাসন রোমক প্রজাতন্ত্রের মৃত্যুর অশুভ সূচনা।

 প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত প্রায় সমস্ত একনায়কতন্ত্রই (যথা: ১৭৯৩ খ্রীষ্টাব্দে ফরাসী ‘পাবলিক সেফ্‌টি’ কমিটি কর্তৃক বা ১৮৪৮ খ্রীষ্টাব্দে জেনারেল ক্যাভিগ্‌নাক কর্তৃক সংকটকালীন ক্ষমতা গ্রহণ) রোমক প্রজাতন্ত্রের সমৃদ্ধিকালের একনায়কতন্ত্রের সহিত তুলনীয়; উভয়ই ছিল সংকটকালীন অস্থায়ী ব্যবস্থা এবং উভয়েরই (ঘোষিত) উদ্দেশ্য ছিল সংবিধানকে রক্ষা করা ও সংকটাবসানে পুনঃপ্রবর্তিত করা।

 কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী কালে (কোনও কোনও রাষ্ট্রে সংবিধানসম্মত আপৎকালীন শাসনব্যবস্থার কথা ছাড়িয়া দিলেও) সমস্ত একনায়কতন্ত্রের উদ্দেশ্য ছিল কোনও নায়ক বা তাহার পরিপোষক গোষ্ঠীর স্বার্থে নিয়মতন্ত্রকে সংকুচিত বা ধ্বংস করা।

 শাসনতান্ত্রিক অস্থায়িত্ব, বহিরাক্রমণ বা তাহার আশঙ্কা, অর্থনৈতিক সংকট, অন্তর্বিপ্লব বা অন্যান্য অসাধারণ অবস্থাতেই সাধারণতঃ একনায়কতন্ত্রের আবির্ভাব হয়।
যে সকল রাষ্ট্রে নিয়মতান্ত্রিক ঐতিহ্য সুপ্রতিষ্ঠিত নহে সেখানে একনায়কতন্ত্রের অভ্যুত্থান অপেক্ষাকৃত সহজ।

 যুদ্ধোত্তর সামাজিক, রাষ্ট্রনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার ফলে ইতালিতে ফ্যাসিবাদী এবং জার্মানিতে নাৎসিবাদী একনায়কতন্ত্রের অভ্যুত্থান প্রতিষ্ঠিত হয়। গণতন্ত্রের দুর্বলতাই ইতালিতে ফ্যাসিবাদী এবং জার্মানিতে নাৎসিবাদী একনায়কতন্ত্রের কারণ। তথাকথিত গণতন্ত্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ন্যায় ও সাম্যের নীতি প্রয়োগ করিতে সমর্থ হয় না। গণতন্ত্রের এই দুর্বলতা প্রকট হইয়া দাড়ায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলিতে ব্যাপক কর্মহীনতা, মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্যাভাব, অত্যধিক করভার, জাতিগত বৈষম্য প্রভৃতি সমস্যার সমাধান না হওয়ায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। গণতান্ত্রিক ও সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দলসমূহের নেতৃবৃন্দের রাষ্ট্রনৈতিক অদূরদর্শিতা ও শোচনীয় ব্যর্থতার সুযোগ গ্রহণ করিয়া ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দে ইতালিতে মুসোলিনি এবং ১৯৩৩ খ্রীষ্টাব্দে জার্মানিতে হিটলার রাষ্ট্রকর্তৃত্ব হস্তগত করেন এবং ক্রমে নিয়মতন্ত্রের সকল চিহ্ন মুছিয়া ফেলেন।

 সাধারণতঃ একনায়ক সামরিক বলপ্রয়োগে কিংবা ভীতিপ্রদর্শনের দ্বারা ক্ষমতা হস্তগত করে এবং পরে নূতন নিয়মতন্ত্রের মাধ্যমে নিজেকে আইনের মর্যাদা দিবার চেষ্টা করে। প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন অন্যায় নির্বাচনে একনায়ক স্বীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য একটি সংবিধান অনুমোদন করাইয়া লয়।

 একনায়কতন্ত্র কখনই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের ভিত্তিতে গঠিত হইতে পারে না। আপাতদৃষ্টিতে একজন বা মুষ্টিমেয় কয়েকজন শাসককে দেখা গেলেও পশ্চাৎপটে থাকে শ্রেণী বা গোষ্ঠী-বিশেষের স্বার্থপ্রসূত সমর্থন। প্রায় সর্বত্রই একনায়কতন্ত্র কোনও প্রতিক্রিয়াশীল দল বা গোষ্ঠী কর্তৃক পরিপুষ্ট এবং তাহাদের স্বার্থরক্ষায় সমধিক আগ্রহী।

 পরিপোষক শ্রেণী বা গোষ্ঠা, সেনাবাহিনী এবং আমলাতন্ত্রের সমর্থন সাধারণতঃ একনায়ককে তাহার ক্ষমতায় আসীন রাখে। কিন্তু বর্তমান যুগের একনায়ককে জনসমর্থন লাভ করিবারও চেষ্টা করিতে হয়। আধুনিক একনায়কতন্ত্র এক দিকে যেমন মত প্রকাশের এবং প্রচারের স্বাধীনতাকে খর্ব করিয়া এবং প্রয়োজন হইলে গুপ্ত পুলিশের সাহায্যে দমননীতি গ্রহণ করিয়া বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর একাংশের স্বাভাবিক বিরোধিতাকে দমন করে, অন্য দিকে তেমন বিদেশীদের প্রতি ঘৃণা প্রচার এবং অন্যান্য চতুর প্রচারের মাধ্যমে জনমত গঠন ও পরিচালন করিবার চেষ্টা করে।

 একনায়কতন্ত্র বিপ্লব বা অন্য কোনও অবস্থার দ্বারা বাধ্য

২০