—১. নদী-উপত্যকার পলিমাটি ২. লালমাটি ৩. কাঁকরিয়া মাটি ৪. কৃষ্ণবর্ণ এঁটেল মাটি ৫. মরুভূমির ক্ষার মাটি ও ৬. নোনামাটি। সিন্ধু-গঙ্গা উপত্যকার পলিমাটি পশ্চিমে সিন্ধু উপত্যকার সমতলভূমি হইতে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা পর্যন্ত উত্তর ভারতের প্রায় সর্বত্র বিস্তৃত। ইহা যথেষ্ট উর্বর এবং কৃষির উপযোগী। কিন্তু বহু যুগ ধরিয়া চাষের ফলে বহু স্থানে নাইট্রোজেন ও ফস্ফরাসের অভাব দেখা দিতেছে। লাল মাটি প্রধানতঃ দাক্ষিণাত্যে বর্তমান। কৃষির পক্ষে এই মাটি নিকৃষ্ট মানের। ইহাতে সাধারণতঃ নাইট্রোজেন, ফসফেট ও পটাশের কম-বেশি ঘাটতি ও লৌহের আধিক্য আছে। কাঁকরিয়া বা মাকড়া পাথর (ল্যাটেরাইট)-সংযুক্ত মাটি দাক্ষিণাত্যের পূর্বঘাট অঞ্চলে, ওড়িশার কিছু অংশে, বিহারের ছোটনাগপুর অঞ্চলে ও বাংলার পশ্চিম জেলাগুলিতে দেখিতে পাওয়া যায়। ইহা কৃষিকার্যের পক্ষে নীরস, অম্লরসযুক্ত ও নাইট্রোজেন, ফসফেট ও পটাশের অভাববিশিষ্ট। কৃষ্ণমৃত্তিকা প্রধানতঃ মধ্য ভারত এবং পশ্চিম ভারতের মালভূমিতে সীমাবদ্ধ। ইহা মোটামুটি উর্বর। ক্ষার মাটি রাজস্থান এবং পাঞ্জাবের মরুভূমি অঞ্চলে বর্তমান। ইহাতে নাইট্রোজেনের অভাব অত্যন্ত বেশি এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা ব্যতিরেকে চাষ সম্ভব নহে। দক্ষিণ বঙ্গ, ওড়িশা, মাদ্রাজ এবং গুজরাতের সমুদ্রকূলবর্তী এলাকায় নোনা মাটি বর্তমান।
মাটির অন্তর্গত বালুকণা, পলি ও কাদার পরিমাণের তারতম্য অনুসারে এবং কৃষির উপযোগিতা বিচার করিয়া, চাষের মাটিকে সাধারণভাবে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, বেলে, দোআঁশ এবং এঁটেল। বেলে মাটিতে বালুকণার পরিমাণ বেশি এবং কাদা ও জৈব পদার্থ কম থাকায় উর্বরতা এবং জলধারণের ক্ষমতাও কম। কিন্তু উপযুক্ত সার প্রয়োগে এবং সেচের সাহায্যে এরূপ মাটিতে ভাল ফসল জন্মায়। দোআঁশ মাটিতে সূক্ষ্ম পলির পরিমাণ সর্বাপেক্ষা বেশি এবং কাদা বা বালুকণার পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম। জৈব পদার্থ বেশি থাকায় ইহা অত্যন্ত উর্বর। ইহার জলধারণের ক্ষমতাও বেশি অথচ জল দাঁড়ায় না। কৃষির বিচারে ইহাই চাষের পক্ষে সর্বাপেক্ষা উপযোগী। এঁটেল মাটিতে কাদার পরিমাণ বেশি, বালুকণা এবং সূক্ষ্ম পলির পরিমাণ নিতান্ত অল্প। জৈব পদার্থে পূর্ণ থাকায় এঁটেল মাটি অত্যন্ত উর্বর। জল দাঁড়ায় বলিয়া এঁটেল মাটিতে জলনিকাশের সুব্যবস্থা প্রয়োজন এবং উপযুক্ত সময় বুঝিয়া চাষ করিতে হয়।
মাটির পরেই কৃষির ব্যাপারে জলের প্রয়োজনীয়তা সর্বাপেক্ষা বেশি, জলের সাহায্যে উদ্ভিদ মাটি হইতে খাদ্যউদ্ভিদ নিজের বৃদ্ধির জন্য মাটি এবং বায়ুমণ্ডল হইতে খাদ্য গ্রহণ করে। ইহার ফলে মাটিতে সঞ্চিত খাদ্য ক্রমাগত ক্ষয় হইতেছে। নানা প্রাকৃতিক কারণেও মাটির উর্বরতা প্রতিনিয়ত হ্রাস পাইতেছে। নিয়মিত জমিতে সার প্রয়োগ করিয়া মাটির এই অবক্ষয় রোধ করা যায়। সারকে জৈব এবং রাসায়নিক—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। উদ্ভিজ্জ বা পশু-পক্ষী হইতে উৎপাদিত সারকে জৈব সার এবং কারখানায় প্রস্তুত নাইট্রোজেন, পটাশ ও ফসফেট জাতীয় সারকে রাসায়নিক সার বলা হয়। জৈব সার পরিমাণে বেশি দিতে হয়, জৈব সার মাটির গুণের উন্নতিসাধন করে। রাসায়নিক সার সহজে দ্রবণীয় বলিয়া অল্প পরিমাণে প্রয়োগ করিতে হয়। ক্রমাগত রাসায়নিক সার ব্যবহার করিলে জমির অম্লতা বৃদ্ধি পায়। ইহা প্রতিরোধের জন্য জৈব সারেরও ব্যবহার বিধেয়। একটি সাধারণ ফসলের একর প্রতি ১০০৮ কিলোগ্রাম ফসল হইলে, উক্ত ফসল জমি হইতে প্রায় ৭০০ কিলোগ্রাম নাইট্রোজেন, ৪৮ কিলোগ্রাম পটাশ, ১৪ কিলোগ্রাম ফসফেট গ্রহণ করে। প্রাকৃতিক নিয়মে এই খাদ্যের কিছু অংশ জমিতে ফিরিয়া আসে। কিন্তু উর্বরা শক্তি বজায় রাখিতে হইলে, জমিতে নিয়মিতভাবে জৈব এবং রাসায়নিক সার প্রয়োগ একান্তভাবে প্রয়োজন।
কৃষিকার্যের প্রধান উপকরণ ভূমি এবং কৃষক। কৃষকের কর্মক্ষমতার উপর উৎপাদনের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে। ভারতের কৃষকের জোতজমির গড় আয়তন মাত্র ৩ হেক্টর (৭৬ একর), যেখানে আমেরিকায় ইহার পরিমাণ ৫৭ হেক্টর (১৪০ একর) ও যুক্তরাজ্যে ১১ হেক্টর (২৭ একর)। ভারতীয় কৃষকদের মধ্যে শতকরা ৫০ জনেরও অধিকের জোতজমির আয়তন ২ হেক্টরের (৫ একর) কম। এই স্বল্পায়তন জমিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে খণ্ডিতভাবে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত। এরূপ অবস্থায় জমি হইতে যাহা উৎপাদিত হয় তাহাতে কায়ক্লেশে একটি কৃষক-পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হইতে পারে। পণ্য রূপে বিক্রয়ের জন্য উদ্বৃত্ত শস্য সাধারণতঃ থাকে না। ভারতে জন পিছু গড় আয় যেখানে বৎসরে ৩৩৩ টাকা, একজন কৃষিজীবীর সেখানে গড় আয় বৎসরে মাত্র ২২৪ টাকা। গবেষণালব্ধ উন্নততর প্রযুক্তিবিদ্যা গ্রহণের মত শিক্ষা কিংবা তাহা প্রয়োগের মত মূলধন কৃষকদের নাই। ভারতের কৃষিজ দ্রব্যের গড় উৎপাদন অন্যান্য উন্নত দেশসমূহের তুলনায় অনেক কম। যেখানে একর পিছু ধানের উৎপাদন৩৮৯