বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/৪৯

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
এঙ্গেল্‌স, ফ্রিড্‌রিষ
এচিং

মার্কস্-এঙ্গেল্‌সের যুগ্ম রচনা। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে ইউটোপিয়ান বা কল্পরাজ্যমূলক ধ্যানধারণা হইতে মুক্ত করার ব্যাপারে এঙ্গেল্‌স-এর দান এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। সমাজতন্ত্রের সম্ভাবনা যে ঐতিহাসিক গতির ক্রিয়াপ্রক্রিয়াতেই অনিবার্য তাহা এঙ্গেল্‌স-এর বিশ্লেষণে বৈজ্ঞানিক সত্যের নিশ্চিতি পায় (অ্যাণ্টি-দ্যূরিং, ১৮৭৮ খ্রী)। তাহার অর্থ ইহা নহে যে তিনি কোনও রূপ যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিপোষকতা করেন। বরং নূতন সমাজ নির্মাণের সংগ্রামে মানুষের সচেতন ভূমিকার গুরুত্ব এবং সেই প্রসঙ্গে যান্ত্রিক বস্তুবাদ হইতে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মৌলিক পার্থক্যের ব্যাখ্যা তৎপ্রণীত ‘লুড্‌ভিগ ফয়ের্‌বাখ্ উন্‌দ দের্‌ আউসগাংগ দের্‌ ক্লাসিশেন ডয়েট্‌শেন ফিলজ্‌ফি’ (লুড্‌ভিগ ফয়ের্‌বাখ ও চিরায়ত জার্মান দর্শনের অবসান, স্টুট্‌গার্ট, ১৮৮৮ খ্রী) নামক গ্রন্থের প্রধান বিষয়বস্তু। ‘দের্‌ উর্‌দ্রুং দের্‌ ফামিলিয়ে দেস্‌ প্রিফাট আইগেণ্টুম্‌স উন্‌দ দেস্‌ স্টাট্‌স’ (পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি, লাইপ্‌ৎসিক, ১৮৮৪ খ্রী) গ্রন্থে এঙ্গেল্‌স আদিম মানবসমাজ হইতে আধুনিক রাষ্ট্র পর্যন্ত সভ্যতার স্তর-পরম্পরার গতি ও প্রকৃতি ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দিক দিয়া আলোচনা করিয়াছেন। আদিম সমাজ সম্পর্কে এই গ্রন্থের বহু তথ্য এল. এইচ. মর্‌গ্যান (১৮১৮-৮১ খ্রী)-এর ‘এনশেণ্ট সোসাইটি’ (প্রাচীন সমাজ, নিউ ইয়র্ক, ১৮৭৭ খ্রী) গ্রন্থ হইতে সংকলিত। পরবর্তী কালে নৃবিদ্যার গবেষণার এমন তথ্য উদ্‌ঘাটিত হইয়াছে যাহার ফলে এঙ্গেল্‌স-এর কোনও কোনও প্রতিপাদ্য সম্পর্কে সন্দেহ জাগে। তাঁহার ‘ডিয়ালেক্‌টিক দের্‌ নাটুর’ (প্রকৃতির ডায়ালেক্‌টিক, ১৯২৫ খ্রী) বইটিরও কোনও কোনও বিশ্লেষণ আধুনিক বিজ্ঞানে গ্রাহ নয়। মার্ক্‌সবাদী চিন্তাধারার বিকাশে এঙ্গেল্‌স-এর দান মার্ক্‌স-এঙ্গেল্‌স পত্রাবলীর প্রামাণিক সংগ্রহেও পরিস্ফুট।

 মার্ক্‌স-এর মৃত্যুর (১৮৮৩ খ্রী) পর এঙ্গেল্‌স-এর জীবনের শেষ ১০-১২ বৎসর মার্ক্‌সবাদকে প্রতিষ্ঠিত করিবার প্রয়াসে নিয়োজিত হইয়াছিল। ‘দাস্ কাপিটাল’ (পুঁজি) গ্রন্থের দ্বিতীয় (১৮৮৫ খ্রী) ও তৃতীয় (১৮৯৪ খ্রী) খণ্ড মার্ক্‌স-এর মৃত্যুর পর এঙ্গেল্‌স কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত হয়। ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দের ৬ মার্চ লণ্ডনে তাঁহার মৃত্যু হয়। ‘মাক্‌স, কার্ল’ দ্র

দ্র কার্ল মার্ক্‌স ও ফ্রেডারিক এঙ্গেল্‌স, রচনা সংকলন, প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, মস্কো, ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ; Franz Mehring, Karl Marx, The Story of His Life,

London 1936; George Lichtheim, Marxism, London, 1961.

সুকুমার মিত্র

এচিং চিত্রকর্মের পদ্ধতি বিশেষ। এচিং শব্দটির উদ্ভব সম্ভবতঃ প্রাচীন হাই জার্মান esjan অথবা প্রচলিত জার্মান atzen (অ্যাৎসেন্‌=জারণ করা) হইতে। বাংলায় বলা যাইতে পারে: অম্লজারিত রেখাচিত্র।

 এচিং মূলতঃ এনগ্রেভিং (কফ্‌ৎগারি বা খোদকারি) পদ্ধতির রূপভেদ (‘লাইন এনগ্রেভিং’ দ্র)। পাশ্চাত্ত্যে ষোড়শ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এই চিত্রপদ্ধতির প্রথম প্রচলন দেখা গেলেও ভারতে প্রাচীন ও মধ্য-যুগে প্রচলিত শলাকালেখ পদ্ধতি ও মোগল কফ্‌ৎগারি পদ্ধতির সঙ্গে ইহা খুবই ঘনিষ্ঠ।

 ভারতীয় শলাকালেখ পদ্ধতিতে প্রয়োজন হইত ধাতুনির্মিত বা হীরকাগ্র সূচিমুখ শলাকা। শিল্পীর সবল হাতের অনায়াস টানে বিভিন্ন প্রকারের জমিতে ক্ষোদিত রেখাচিত্র রূপায়িত হইত—‘যৈঃ সর্বত্র শলাকায়েব লিখিতৈর্দিগ্‌ভিওয়াশ্চিত্রিতাঃ' (ত্রিবিক্রমভট্ট রচিত ‘নলচম্পূ’, শ্লোক ৩৫)। অবশ্য ভারতীয় এই পদ্ধতি সাধারণতঃ অক্ষর রচনা ও অলংকরণের প্রয়োজনই মিটাইয়াছে। মধ্যযুগে মোগল ও রাজপুত দরবারে বর্ম, ঢাল, তলোয়ার প্রভৃতির অলংকরণে অম্লজারণ পদ্ধতির ব্যবহার ঘটিয়াছে। তৎকালে খোদকারদের মধ্যে আপন ঘরোয়ানার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নকশা সংরক্ষণের প্রয়োজনে নিজ নিজ খোদাই-কাজ হইতে তেল-কালির ছাপ তুলিয়া রাখার প্রচলন ছিল।

 এচিং-এর ব্যবহারবিধি প্রাথমিকভাবে শলাকালেখের অনুরূপ হইলেও উদ্দেশ্যের দিক দিয়া বিপরীত। শলাকালেখে প্রতিটি রচনাই একক। কিন্তু জারিত রেখাচিত্রের প্রয়োজন একই রচনার বহু প্রতিলিপিকরণে। এচিং করিতে গেলে প্রথমেই একটি ধাতুফলকের প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্যে সাধারণতঃ তাম্রফলক ব্যবহৃত হয়। তাম্রফলকটিতে রজন বা অন্য কোনও অম্লনিরোধক রাসায়নিক প্রলেপ মাখানো হয়। অতঃপর তীক্ষ্ণাগ্র শলাকা দ্বারা চিত্রকর্ম সম্পাদিত হয়। শলাকার ঘর্ষণে প্রলেপ কাটিয়া ধাতুফলক উন্মুক্ত হয়। এইবার ধাতুফলকটিকে নাইট্রিক অ্যাসিড কিংবা অনুরূপ অম্ল পদার্থের (ডাচ মর্‌ড্যাণ্ট প্রভৃতি) জলীয় দ্রবণে ডুবাইয়া রাখা হয়। উন্মুক্ত ধাতব অংশ এই ভাবে অম্লজারিত হয়। অবশ্য রেখার সূক্ষ্মতা ও গভীরতার উপর জারণপদ্ধতি নির্ভর করে। সূক্ষ্ম রেখার প্রয়োজন হইলে স্বল্প কাল জারণের পরেই ফলকটি উঠাইয়া

৩০