চিনি উৎপাদন, সরকারি বিশেষতঃ সমর বিভাগের সরবরাহ, চীনে অহিফেন রপ্তানি ও মাদ্রাজে চাউল রপ্তানি ইত্যাদি ব্যবসায়ে টাকা খাটাইত। এতদ্ব্যতীত কোম্পানির কাগজ লইয়া ফাটকা এবং ব্যাঙ্ক ও বীমার কারবারে প্রচুর লাভ হইত। ইওরোপের সহিত ব্যক্তিগত বাণিজ্য ইহাদের মাধ্যমেই সম্পন্ন হইত। যে সব কর্মচারী অসদুপায়ে অর্জিত অর্থ বিলাতে পাঠাইতে চাহিত বা নিষিদ্ধ হওয়ার পরও আন্তর্বাণিজ্যে লিপ্ত ছিল— তাহাদের এজেন্সি হাউস ব্যতীত গত্যন্তর ছিল না। এমন কি কোম্পানিও ইহাদের বর্জন করিতে পারিত না। সমগ্র চীনের বাণিজ্য ইহাদের হাতে ছিল এবং সাম্রাজ্যবিস্তারার্থ যুদ্ধ উপস্থিত হইলে ঋণের জন্য ইহাদেরই দ্বারস্থ হইতে হইত। ১৭৯০ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায় ১৫টি এজেন্সি হাউস ছিল। তন্মধ্যে ফার্গুসন ফেয়ার্লি অ্যাণ্ড কোম্পানি, ল্যাম্বার্ট অ্যাণ্ডারসন, কলভিন্স অ্যাণ্ড ব্যাজেট প্রভৃতি বিখ্যাত। পরবর্তী কালে পামার অ্যাণ্ড কোম্পানি, অ্যালেকজাণ্ডার অ্যাণ্ড কোম্পানি ইত্যাদির খুব নাম হইয়াছিল। ইহাদের মধ্যে কেহ কেহ, যেমন ডেভিড স্কট, কোম্পানির উপরও কর্তৃত্ব বিস্তার করিয়াছিল। স্বভাবতঃ ইহারা মুক্ত বাণিজ্যের পক্ষপাতী ছিল। প্রথমে ইহারা আপন আপন জাহাজে ইওরোপের সহিত বাণিজ্য করিবার অধিকার দাবি করে। ১৮১৩ খ্রীষ্টাব্দে ইংল্যাণ্ডের শিল্পপতিদের সহায়তায় ইহারা কোম্পানির একচেটিয়া ভারতবাণিজ্যে মরণ আঘাত হানে। কিন্তু তাহার পর ছত্রাকের মত এজেন্সি হাউসের সংখ্যা বাড়িতে থাকে। পুরাতন অংশিদারগণ অবসর গ্রহণকালে সমস্ত মূলধন লইয়া চলিয়া যাইতে থাকে এবং নূতন অংশিদারগণ তদনুরূপ অর্থ ব্যতিরেকেই ব্যবসায় চালাইবার চেষ্টা করে। ইঙ্গ-ভারতীয় বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিলে নিরুপায় হইয়া ইহারা নীল চাষে প্রায় সমস্ত অর্থ নিয়োগ করিতে থাকে। চীনের সহিত অহিফেন ও কার্পাস ব্যবসায় মার খাওয়ার পর নীলের চাষ আরও বাড়ে; কিন্তু বেণ্টিঙ্কের আমলে নীলের চাহিদা কমিতে থাকায় এজেন্সি হাউসগুলির দুর্দিন শুরু হয় ও একে একে ইহারা ব্যবসায় গুটাইতে বাধ্য হয়। বেণ্টিঙ্ক দেখান— ইহাদের মূলধন বাংলার প্রায় প্রত্যেক বড় ব্যবসায়ে এমনভাবে খাটে যে তাহাদের আকস্মিক পতনে প্রবল আর্থিক বিপর্যয় ঘটিবে এবং যে সব সরকারি কর্মচারী ইহাদের টাকা লগ্নি দিয়াছিল তাহারা সমূলে বিনষ্ট হইবে। সেইজন্য তিনি সরকারি সাহায্য দিয়া ইহাদের বাঁচাইবার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৮২৯ হইতে ১৮৩৪ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে পামার অ্যাণ্ড কোং প্রমুখ ছয়টি বড় এজেন্সি
হাউসের পতন হয়। ‘লণ্ডন টাইম্স’-এর হিসাবে ইহারা প্রায় এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ পাউণ্ড ঋণ রাখিয়া যায়।
ইহাদের ধ্বংসস্তূপের উপরই ম্যানেজিং এজেন্সি প্রথা গড়িয়া উঠিয়াছে। ইহারা যে ব্যবসায়ের মূলনীতিগুলি মানে নাই সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই। প্রথমত: ইহাদের যে পরিমাণ মূলধন ছিল তদপেক্ষা ঝুঁকির পরিমাণ ছিল ঢের বেশি। দ্বিতীয়ত: ইহাদের মুনাফালোভের অন্ত ছিল না, কিন্তু এ কথাও স্বীকার করিতে হয় যে ইহাদের প্রচেষ্টায় বাংলা দেশের বাণিজ্য ও শিল্প প্রভূত লাভবান হইয়াছিল। আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তার ইহাদের অকুণ্ঠ অর্থসাহায্য ব্যতীত সম্ভব হইত না।
দ্র Amales Tripathi, Trade and Finance in the Bengal Presidency, 1793-1833, Calcutta, 1956; N. K. Sinha, Economic History of Bengal, vol. I, Calcutta, 1956.
অমলেশ ত্রিপাঠী
এঞ্জিন যে যন্ত্রের সাহায্যে তাপ অথবা শক্তিকে যান্ত্রিক গতিতে রূপান্তরিত করা যায় তাহাকে এঞ্জিন বলে। এঞ্জিন বাষ্প, তৈল, গ্যাস প্রভৃতি দ্বারা চালিত হইয়া থাকে। ইহার ব্যবহারও নানা প্রকারের হয় আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে আলেকজান্দ্রিয়া শহরে হীরো নামক এক ব্যক্তি বাষ্পচালিত যে যন্ত্র নির্মাণ করেন তাহাকেই আধুনিক এঞ্জিনের আদি রূপ বলা চলে।
বর্তমান কালে মোটরগাড়িতে, জাহাজে, রেলে বা কারখানায় যে সকল এঞ্জিন ব্যবহৃত হয় তাহাদিগকে মোটামুটি দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়: ১. অন্তর্দহন এঞ্জিন ২. বহির্দহন এঞ্জিন।
অন্তর্দহন এঞ্জিন: গ্যাস অথবা তেলের সঙ্গে বাতাসের মিশ্রণে উৎপন্ন দাহ্য পদার্থ এঞ্জিনের সিলিণ্ডারের মধ্যেই জ্বালাইয়া যখন শক্তি উৎপন্ন করা হয় তখন সেই এঞ্জিনকে অন্তর্দহন এঞ্জিন বলে। ডিজেল, পেট্রল ইত্যাদি জ্বালাইয়া এইরূপ এঞ্জিন পরিচালিত হয়।
বহির্দহন এঞ্জিন: এরূপ এঞ্জিনে দহনক্রিয়া সিলিণ্ডারের বাহিরে হইয়া থাকে। উদাহরণ—স্টীম এঞ্জিন, স্টীম টার্বাইন ইত্যাদি। চুল্লির উত্তাপের সাহায্যে বয়লারের জল বাষ্পে পরিণত করিয়া সিলিণ্ডারে তাহা প্রবেশ করাইয়া এঞ্জিন চালিত করা হয়।
জেম্স ওয়াট ১৭৬৯ খ্রীষ্টাব্দে স্টীম এঞ্জিনের পেটেণ্ট গ্রহণ করেন (‘ওয়াট, জেম্স’ দ্র)। বয়লার, ভ্যাল্ব