বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/৫৪

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
এনামেল
এনামেল

দ্রাবকের দ্বারা লৌহপাত্রগুলি ধোয়া হয়। পাত্রের গাত্র সবিশেষ পরিচ্ছন্ন না হইলে উহার উপর এনামেল টেকসই হয় না। পরিষ্কৃত পাত্রের উপর উচ্চচাপের বায়ুর সঙ্গে উত্তপ্ত বালুকারাশি প্রক্ষেপ করা হয়। ইহাতে সূক্ষ্ম বালুকণার সবেগ সংঘর্ষে পাত্রের গাত্র মার্জিত ও নিষ্কলুষ হয়, উপরন্তু ইহাতে পাত্রের উপরিতলে প্রয়োজনীয় বন্ধুরতার সৃষ্টি হয়। এইরূপ বন্ধুরতার ফলে এনামেল প্রলেপের আয়ু বাড়িয়া যায়।

 এনামেল নামক আবরক বস্তুটি কাচের প্রকারভেদ মাত্র। সাধারণতঃ ইহাকে অস্বচ্ছ করা হয়। ইহাতে থাকে কাচের সাধারণ উপাদান, যথা সোডা, চুন, শাদা বালি, বালিমাটি, মেটে সিঁদুর, সোহাগা, ফেল্‌স্‌পার ইত্যাদি; উত্তাপে সহজে নরম হয় না এইরূপ পদার্থ যথা চিনামাটি, কেওলিন ইত্যাদি; অস্বচ্ছতাবিধায়ক উপাদান, যথা টিন ডাইঅক্সাইড ইত্যাদি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ধাতুর অক্সাইড যৌগিক। এইগুলিকে একত্রে পরিমাণমত মিশাইয়া উত্তাপে গলাইয়া কাচে পরিণত করা হয় এবং গলিত অবস্থায় জলের মধ্যে ঢালিয়া দেওয়া হয়। ইহাতে কাচ ছোট ছোট খণ্ডে পরিণত হয়। জল হইতে ছাঁকিয়া তুলিয়া এই খণ্ডগুলিকে বিশেষ যন্ত্রসাহায্যে সূক্ষ্ম চূর্ণে পরিণত করা হয়। এই কাচচূর্ণই এনামেলের মশলা। মশলা অল্প জলে ঘন করিয়া গুলিয়া পরিচ্ছন্ন পাত্রের উপর পাতলা করিয়া লাগাইয়া দেওয়া হয় এবং শুকাইয়া যাইবার পর পাত্রকে উত্তপ্ত করা হয়। তখন পাত্রের গায়ে কাচচূর্ণ গলিয়া গিয়া আচ্ছাদন সৃষ্টি করে।

 সাধারণতঃ এনামেল প্রলেপ কমপক্ষে দুই প্রস্থ দেওয়া হয়। প্রথম প্রলেপের নাম বাস্তপ্রলেপ, পরবর্তীর নাম আচ্ছাদনী ও পালিশ -প্রলেপ। দুইটি প্রলেপের উপাদান মূলতঃ একপ্রকার হইলেও অনেকাংশে পৃথক। বাস্তুপ্রলেপে এমন উপাদান থাকে যাহা উত্তাপের ফলে পাত্রের বস্তুর সঙ্গে ভৌত ও রাসায়নিক উভয়বিধ আকর্ষণে দৃঢ়সংবদ্ধ হয়। এইজন্য দেখা গিয়াছে যে টাইটেনিয়াম-সংবলিত ইস্পাত এনামেলের পক্ষে সাধারণ ইস্পাত অপেক্ষা বেশি উপযোগী। উত্তাপে তরলায়িত বাস্তুপ্রলেপের উপর প্রয়োজনমত শুষ্ক কাচচূর্ণ ছিটাইয়া দেওয়া হয়। ফলে পাত্রটি অবিচ্ছিন্নভাবে বাস্তুপ্রলেপে ঢাকা পড়ে। বাস্তুপ্রলেপের উপরিতল মসৃণ হয় না। দ্বিতীয় বা পরবর্তী প্রলেপের উদ্দেশ্য—পালিশ করা নিশ্ছিদ্র মসৃণ অবতল সৃষ্টি এবং অলংকরণ। প্রথম ও পরবর্তী প্রলেপের উপাদানের এই হিসাবেই কিঞ্চিৎ তারতম্য করিতে হয়, যাহাতে
উভয়ের সান্দ্রতা প্রসারণ ও বিশেষতঃ গলনাঙ্ক প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত করা যায়। আচ্ছাদনী ও পালিশ -প্রলেপের গলনাঙ্ক বাস্তপ্রলেপের গলনাঙ্ক অপেক্ষা কম রাখা হয়। সাধারণতঃ ৭০০-১৩০০ ডিগ্রি সেণ্টিগ্রেডে উত্তপ্ত করিয়া পাত্র এনামেল করা হয়। অলংকরণের জন্য রঙ ফুটাইতে বিভিন্ন ধাতুর অক্সাইড যৌগিক ব্যবহার করা হয়, যথা কোবাল্ট অক্সাইড— নীল; ক্রোমিয়াম অক্সাইড— সবুজ; ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড— বেগুনি; সেলেনিয়াম ও কিউপ্রাস অক্সাইড— লাল রঙের এনামেল উৎপন্ন করে। এই যৌগিকগুলি জলে বা কোনও দ্রাবকে ঘন করিয়া গুলিয়া তুলির সাহায্যে আচ্ছাদনী-প্রলেপের উপর লাগানো হয়। চুল্লিতে উত্তপ্ত করিলে প্রলিপ্ত স্থানগুলি রঙিন চিত্র বা রেখায় পরিণত হয়।

 উপরি-উক্ত ভাবে প্রস্তুত এনামেল-বিন্যস্ত পাত্রকে সহসা ঠাণ্ডা করা হয় না কারণ ইহাতে এনামেলের সহিত পাত্রের বস্তুর বন্ধন শিথিল হইয়া যায় অর্থাৎ ফাটিয়া যাইবার বা চটিয়া যাইবার প্রবণতা বাড়ে। এইজন্য এনামেল-বিন্যস্ত তপ্ত পাত্র অতি ধীরগতিতে শীতল করিবার জন্য সকল কারখানায় ব্যবস্থা রাখিতে হয়।

 এনামেল পাত্র ও আসবাব ক্রমশঃই জনপ্রিয় হইতেছে। ইহার কারণ এই যে কাচের আবরণ থাকার ফলে এইসকল পাত্রের অন্তঃস্থ লোহায় মরিচা ধরে না, বায়ুর আর্দ্রতার জন্য কোনও ক্ষয়-ক্ষতি বা কলঙ্ক পড়ে না এবং অবাধে ও সহজে কাচের পাত্র ও আসবাবের মত ধোয়া-মোছা যায়। অথচ কাচের পাত্রের মত এনামেল পাত্র ভঙ্গুর নহে। কাসা ও পিতলের পাত্র অপেক্ষা এনামেল পাত্র লোহার তৈয়ারি বলিয়া অনেক শস্তা এবং হালকা। এনামেলের আসবাব কাঠের তৈয়ারি আসবাবের মত সহজদাহ্য নহে। এনামেল সাধারণভাবে অম্লের ক্রিয়াও প্রতিরোধ করে।

 এনামেল তৈজসপত্র ও আসবাব আধুনিক কালের সামগ্রী হইলেও, এনামেল শিল্প এই দেশের মত অনেক দেশেই বহু প্রাচীন কাল হইতেই জানা ছিল। অলংকার ও গৃহসজ্জার আসবাবে রঙিন এনামেল বিন্যাসকে এই দেশে ‘মিনা’ বলে। সোনা, রুপা, পিতল ও তামার উপর জয়পুরের মিনার কাজ বিশ্ববিখ্যাত। মহারাজ মানসিংহের তরবারির হাতলের উপরের অপরূপ মিনার কাজ জগদ্বিখ্যাত। মিনার কাজে পাঞ্জাব, কাশ্মীর, কচ্ছ, রামপুর, লখনৌ ও কাশীর বহুকাল যাবৎ প্রসিদ্ধি আছে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে (২।৩) সোনার উপর কাচের অলংকরণের উল্লেখ আছে।

 ইওরোপের ইতিহাসে নবম খ্রীষ্টাব্দে এনামেল

৩৫