এই ধর্মযুদ্ধের ফলাফল সুদূরপ্রসারী। প্রথমতঃ ভেনিস, জেনোয়া এবং অন্যান্য ইতালীয় বন্দরের বণিকগণ ধর্মযোদ্ধাদের অস্ত্র, খাদ্য ও যানবাহন জোগাইয়া প্রভূত সম্পদ সঞ্চয় করে। ঐ বণিকগণ একই কালে খ্রীষ্টান ধর্মযোদ্ধা ও আরবদেশীয় বণিকদের সহিত বাণিজ্য করিত। ক্রমে নৌবাণিজ্যে ইতালীয় বণিকদের আধিপত্য ভূমধ্য সাগর অঞ্চলে স্থাপিত হয়। এশিয়া মহাদেশের সহিত ইওরোপের বাণিজ্যে কেবল আরবী বণিকদের নহে, ইতালীয়দেরও মধ্যস্বত্ব সৃষ্টি হইল। ভূপর্যটনের এই ব্যাপক সুযোগে ইওরোপীয় মননের পরিধি বিস্তৃত হইল। বাণিজ্য-অর্থনীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটিল। ধর্মযুদ্ধের পরবর্তী যুগে আমরা দেখিতে পাই ইওরোপের দেশগুলি পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার পাইবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিতে লাগিল। ঐ চেষ্টার ফলেই অবশেষে আফ্রিকা বেষ্টন করিয়া সমুদ্রপথে ভারতে আসিবার পথ আবিষ্কৃত হয় (‘আফ্রিকা’ দ্র)।
ত্রয়োদশ শতকে মঙ্গোল আক্রমণের ফলে পশ্চিম এশিয়ায় ইসলামের রাষ্ট্রনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি নষ্ট হইয়া যায়। প্রথমে চেঙ্গিজ খাঁ, পরে ওগোটেই, হুলাকু খান ও বাটুর নেতৃত্বে মঙ্গোল সাম্রাজ্য পূর্ব ইওরোপ ও পশ্চিম এশিয়ায় স্থাপিত হয়। ইহার ফলেই সম্ভবতঃ বাণিজ্য-অর্থনীতিতে শেষ পর্যন্ত ইওরোপীয় কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়।
মঙ্গোলদের মতে করেয়া গোষ্ঠী খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীও ছিল। রোম হইতে ঐসব খ্রীষ্টান গোষ্ঠীদের সহিত যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা হয়। ঐ চেষ্টার ফলে বহু খ্রীষ্টান ধর্মযাজক মধ্য এশিয়ায় পরিভ্রমণ করেন। তাঁহাদের মধ্যে কারপিনী (আনুমানিক ১১৮২-১২৫৩ খ্রী), তোসি, হেইভল, উইলিয়াম প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য। ইহাদের ভ্রমণবিবরণে তৎকালের ভূবৃত্তান্ত সম্বন্ধে বহু মূল্যবান সংবাদ পাওয়া যায়। এই পরিস্থিতিতে মার্কো পোলোর (আনুমানিক ১২৫৪-১৩২৪ খ্রী) বিশ্বভ্রমণ শুরু হয় (‘পোলো, মার্কো’ দ্র)। ১২৬০ খ্রীষ্টাব্দে শুরু করিয়া দীর্ঘ ২৫ বৎসর মধ্য এশিয়া ও চীন ভ্রমণ করিয়া তিনি ভেনিসে প্রত্যাবর্তন করেন। মার্কো পোলোর ভ্রমণকাহিনী ইওরোপে তুমুল উত্তেজনার সৃষ্টি করে। পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার সম্পদ সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খ সংবাদে ইওরোপ আশ্চর্য হইয়া যায়। কুবলাই খানের (১২১৪-৯৪ খ্রী) দরবারে খ্রীষ্টান পোলো পরিবারের সম্মানলাভ এক হিসাবে মঙ্গোলভীতি দূর করিতে সাহায্য করে। এশিয়ার সহিত সরাসরি বাণিজ্য করিবার প্রলোভন ক্রমে বৃদ্ধি পাইতে থাকে। বিশেষ করিয়া খ্রীষ্টান পরিব্রাজকদের কাছে চীনের রুদ্ধদ্বার খুলিয়া যায়। মার্কোচতুর্দশ শতকের অপর এক নিষ্ঠাবান পরিব্রাজক—ইব্ন বতুতার (১৩০৪-৭৮ খ্রী) কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।
ইব্ন বতুতার ভ্রমণ ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মার্কো পোলোর বিবরণ হইতে চীন দেশের সংবাদ যেমন আমরা পাইয়া থাকি, তেমনই ইব্ন বতুতার বিবরণে অ্যাটল্যাণ্টিক হইতে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত অঞ্চলের সমাজনীতি, বাণিজ্য, সম্পদ এবং রাজ্যশাসনব্যবস্থার সংবাদ সংগৃহীত হয়। পৃথিবীর স্থলভাগের আয়তন, তাহাদের অবস্থিতি এবং সমুদ্রপথে তাহাদের সহিত সংযোগ রক্ষা করিবার সুযোগ-সুবিধাগুলি লিপিবদ্ধ হয়। বিশেষ করিয়া ভারতবর্ষ ও আরব দেশ সম্বন্ধে তাঁহার সংগৃহীত তথ্য অসাধারণ মূল্যবান (‘ইবন বতুতা’ দ্র)।
পঞ্চদশ শতকের শেষ ভাগে ইওরোপ আফ্রিকা বেষ্টন করিয়া ভারতে পৌঁছিবার নৌপথ এবং আমেরিকা আবিষ্কার করিল। ফলে এশিয়া ও ইওরোপ মহাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের এক নূতন যুগের সূচনা হইল। এশিয়া ও ইওরোপের বাণিজ্যে মধ্যস্বত্বের অবলুপ্তি ঘটিল। ইওরোপীয় বণিকগণ সরাসরি এশিয়ার সহিত বাণিজ্যে লিপ্ত হইল এবং ক্রমে নানা স্থানে স্বীয় সাম্রাজ্য বিস্তার করিতে লাগিল। ইহাতে পর্তুগাল, স্পেন, হল্যাণ্ড, ফ্রান্স ও ইংল্যাণ্ডের বণিকগণ অংশগ্রহণ করে। ইহার পর হইতে ইওরোপ মহাদেশের অর্থনৈতিক উৎপাদন প্রথার ক্রমোন্নতি এবং এশিয়া মহাদেশের অর্থনীতির ক্রম-অবনতি ঐতিহাসিক কারণে যুক্ত হইয়া পড়িল।
দক্ষিণ এশিয়ায় পৌঁছিবার জন্য যে সব পর্তুগীজ নাবিক অগ্রণী তাঁহাদের মধ্যে বার্তোলোমেউ দিয়াস্ (আনুমানিক ১৪৫০-১৫০০ খ্রী), লুডোভিকো ডি ভারথেমা, ভাস্কো দা গামা (আনুমানিক ১৪৬৯ - ১৫২৫ খ্রী), পেড্রো আলভারেস কাবরাল, ফ্রান্সিস্কো দে আলমেইদা (আনুমানিক ১৪৫০-১৫১০ খ্রী), ডিয়েগো লোপেস ডি সেকিরা, মাহেল্লান ও আল্বুকের্ক (১৪৫৩-১৫১৫ খ্রী) এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করিতে হইবে (‘আল্বুকের্ক’ দ্র)। ইহাদের চেষ্টায় সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বহু পর্তুগীজ কুঠি স্থাপিত হয়।
ষোড়শ শতকে স্পেন ও পর্তুগাল পৃথিবীর নৌবাণিজ্যে সর্বময় নেতা ছিল। কিন্তু সপ্তদশ শতকে ওলন্দাজ ও ইংরেজ বণিকগণ সংগঠিত হইয়া ঐ নেতৃত্ব পাইবার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করে। বিশেষ করিয়া ওলন্দাজদের চেষ্টায়৬৮