বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/৯৩

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
এশিয়াটিক সোসাইটি
এশিয়াটিক সোসাইটি

 প্রথম কয়েক বৎসর সোসাইটির মুখপত্র হিসাবে কোনও পত্রিকা প্রকাশ করা হইত না। ১৭৮৮ খ্রীষ্টাব্দ হইতে ১৭৯৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ‘এশিয়াটিক রিসার্চেস’ নামক পত্রিকার পাঁচ খণ্ড প্রকাশিত হয়। ইহাতে সোসাইটিতে পঠিত প্রবন্ধাদি ও আলোচনা প্রকাশিত হইত। ষষ্ঠ খণ্ড বাহির হইবার সময় হইতে সোসাইটি এই পত্রিকার ব্যয় বহন করিতে সম্মত হন। পণ্ডিতসমাজে এশিয়াটিক রিসার্চেসের খুব আদর হইয়াছিল, কিন্তু সোসাইটির পক্ষে বেশি দিন ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হয় নাই। ১৮২৯ খ্রীষ্টাব্দে এই পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হইয়া যায়। কিন্তু এই বৎসর হইতেই আবার ‘গ্লীনিংস ইন সায়েন্স’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ইহাতেও এশিয়াটিক সোসাইটিতে পঠিত প্রবন্ধ ও আলোচনা প্রকাশিত হইতে থাকে। প্রথমে ক্যাপ্টেন হারবার্ট ও পরে জেম্‌স প্রিন্‌সেপ ইহার সম্পাদনা করিতেন। ১৮৩২ খ্রীষ্টাব্দে এশিয়াটিক সোসাইটির এক সভায় স্থির হয় এই পত্রিকার নাম পরিবর্তন করিয়া ‘জার্নাল অফ দি এশিয়াটিক সোসাইটি’ করা হইবে। এই বৎসরই জার্নালের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। কিন্তু তখনও এই পত্রিকাকে এশিয়াটিক সোসাইটির মুখপত্র বলা হইত না। আরও দশ বৎসর পরে পত্রিকাটি এই স্বীকৃতি লাভ করে।

 এশিয়াটিক সোসাইটি হইতে বহু গবেষণাগ্রন্থ ও আকর-গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছে। ‘বিব্‌লিওথেকা ইণ্ডিকা’ গ্রন্থমালাই সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। এই গ্রন্থমালায় সংস্কৃত, পালি, আরবী, ফারসী ও অন্যান্য ভাষায় মূল গ্রন্থ বা তাহার অনুবাদ সম্পাদিত হইয়া প্রকাশিত হইয়াছে। এই গ্রন্থমালায় প্রকাশিত পুস্তকের সংখ্যা শতাধিক হইবে। ভারতবর্ষের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিবরণ লিখিবার পক্ষে এই আধার গ্রন্থগুলি অমূল্য।

 এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রন্থাগারে রক্ষিত পুস্তকের সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ এবং বিভিন্ন ভাষার প্রাচীন পুথির সংখ্যা চল্লিশ হাজারের বেশি হইবে। সংস্কৃত ও ফারসী ভাষায় লিখিত পুথি ছাড়াও তিব্বতী, বর্মী, চীনা এবং শ্যাম দেশ ও যবদ্বীপ হইতে আনীত পুথিও আছে। সোসাইটির গ্রন্থাগারে কিছু তাম্রশাসন ও বহু পরিমাণ প্রাচীন মুদ্রাও সংরক্ষিত আছে। ১৮১৪ খ্রীষ্টাব্দে একটি পুরাতত্ত্ব ও বিজ্ঞান-বিষয়ক সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৩৭ খ্রীষ্টাব্দে এশিয়াটিক সোসাইটি ভারত সরকারকে কলিকাতায় একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করিতে অনুরোধ করেন। ইহাতে তখন কোনও ফল হয় নাই। ১৯৫৭ খ্রীষ্টাব্দে পুনরায় ভারত সরকারকে এই অনুরোধ করা হয়
এবং সোসাইটির সংগ্রহ এই জাদুঘরে দান করা হইবে বলিয়া প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ইহার নয় বৎসর পরে ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দে ভারত সরকার কলিকাতায় ইণ্ডিয়ান মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করিবেন এইরূপ স্থির করেন। এশিয়াটিক সোসাইটির দান ও চেষ্টার ফলে ইণ্ডিয়ান মিউজিয়াম ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল এইরূপ মনে করা অসংগত হইবে না। এখন জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়া, জুঅলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়া বা বোটানিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়া যে কাজ করেন এইসব প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হইবার পূর্বে সেই ধরনের কাজের ভার এশিয়াটিক সোসাইটি গ্রহণ করিতেন। এখন হইতে পঞ্চাশ বৎসরের কিছু পূর্বে যখন ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সূচনা হয়, তখনও এই প্রতিষ্ঠান স্থাপনার জন্য এশিয়াটিক সোসাইটি যথেষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ভারতবর্ষের বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাস উদ্ধার করা সম্ভব হইয়াছে। ১৮৩৭ খ্রীষ্টাব্দে এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য জেম্‌স প্রিন্‌সেপ অশোক-অনুশাসনের ব্রাহ্মীলিপি পাঠ করেন। ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসে ইহা একটি যুগান্তকারী ঘটনা।

 প্রথম যুগে সোসাইটির নিজস্ব কোনও গৃহ ছিল না, সে কথা পূর্বে বলা হইয়াছে। ১৮০৫ খ্রীষ্টাব্দে চৌরঙ্গি ও পার্ক স্ট্রীটের সংযোগস্থলে একখণ্ড জমি ভারত সরকার সোসাইটিকে দান করেন। ১৮০৮ খ্রীষ্টাব্দে এই স্থানে সোসাইটির গৃহ নির্মিত হয়। কালক্রমে এই গৃহ জীর্ণ হইয়া পড়ায় এবং স্থান সংকুলান না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ সোসাইটির সংলগ্ন জমিতে নূতন গৃহ নির্মাণ করা স্থির করেন। ভারত সরকার ও পশ্চিম বঙ্গ সরকারের অর্থানুকুল্যে ইহার এক অংশের কাজ সমাপ্ত হইয়াছে। ১৯৬৫ খ্রীষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে ডক্টর সর্বেপল্লী রাধাকৃষ্ণন এই নবনির্মিত ভবনের দ্বার উন্মোচন করিয়াছেন।

 এশিয়াটিক সোসাইটির বর্তমান সদস্যসংখ্যা প্রায় ছয়শত। পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক দেশেই পণ্ডিতসমাজের মধ্যে এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য আছেন। প্রতি বৎসর সদস্যদের মধ্য হইতে কুড়িজন নির্বাচিত সদস্য লইয়া একটি পরিচালনামণ্ডলী গঠিত হয়। সোসাইটির কার্যপরিচালনার ভার এই মণ্ডলীর উপর ন্যস্ত থাকে।

দ্র যোগেশচন্দ্র বাগল, কলিকাতার সংস্কৃতি-কেন্দ্র, কলিকাতা, ১৩৬৬ বঙ্গাব্দ; Centenary Review of the Asiatic Society of Bengal, Calcutta, 1885.

প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত

৭৪