বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/৯৭

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
ঐসলামিক দর্শন
ঐসলামিক দর্শন

ফখরউদ্দীন রাজীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খ্রীষ্টীয় নবম শতাব্দীর মধ্য ভাগে তিনি জীবিত ছিলেন। তিনি প্রয়োগবাদী (প্র্যাগ্‌ম্যাটিক) দার্শনিক ছিলেন। গ্রীকদের চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হইলেও তিনি জড় পদার্থের মধ্যে গতি স্বীকার করিতেন এবং এই বিষয়ে আধুনিক পরমাণুবাদের সহিত তাঁহার বক্তব্যের সাদৃশ্য লক্ষিত হয়। দার্শনিক মতবাদে তিনি পাঁচটি চিরন্তন সত্তার অস্তিত্ব স্বীকার করিয়াছেন। তাঁহার মতানুসারে স্রষ্টা, বিশ্বাত্মা, প্রাথমিক জড় পদার্থ, নির্বিশেষ স্থান ও কাল এই পাঁচটিই আদিম সত্তা। পরিবর্তনশীল জগৎ এই পাঁচটি সত্তার সৃষ্টি। বস্তু, স্থান ও কাল সম্বন্ধে তাঁহার ধারণা অনেকটা কাণ্টের ধারণার অনুরূপ। তাঁহার মতবাদ অনুসারে সৃষ্টির ইন্দ্রিয়জ জ্ঞানের মধ্যে ইহাদের ধারণা বিদ্যমান। এই বিশ্বের সুসংবদ্ধ অবস্থা দেখিয়া একজন জ্ঞানী স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকারে বাধ্য হইতে হয়।

 মুতাজিলাদের প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে, তাহারা তর্কবুদ্ধির দ্বারা প্রণোদিত হইয়া নানা দিক দিয়া প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস সংক্রান্ত অনেকগুলি প্রত্যয় অস্বীকার করিয়াছে। পরবর্তী কালে অশরিয়া মতবাদীগণ তাহাদের এই মতাদর্শকে তীব্রভাবে আক্রমণ করিয়াছে। তাহাদের মতবাদের দুইটি দিক। নঞর্থক দিক হইতে বিচার করিলে তাহাদের মতবাদকে মুতাজিলাদের মতবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ বলা যায়। অশরিয়াদের মতানুসারে আল্লাহ্‌র সত্তাগত ঐক্যের সঙ্গে তাঁহার গুণাবলীর অসামঞ্জস্য রহিয়াছে বলিয়া মুতাজিলা মতবাদে যে ধারণা রহিয়াছে তাহা অমূলক। তেমনই কোরান বাহ্যতঃ হজরত মহম্মদের নিকট প্রেরিত হওয়ার পূর্বেও ফিরিশ্‌তাদের কাছে প্রকাশিত হইয়াছিল, কাজেই কোরান শাশ্বত। ইচ্ছার স্বাধীনতা সম্বন্ধেও মুতাজিলা মতবাদ ভ্রান্ত। কারণ, আল্লাহ্‌র ইচ্ছার দ্বারা এই দুনিয়ার সব কিছুই নিয়ন্ত্রিত। মানুষ নিমিত্ত মাত্র। মানুষের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র ইচ্ছাই রূপায়িত হইতেছে।

 অশরিয়া মতবাদের সর্বশেষ পরিণতিতে দেখা দেয় ইমাম গাজ্জালীর দর্শন। তাঁহাকে অশরিয়া মতবাদের তীব্র প্রতিবাদও বলা যায়। অশরিয়া মতবাদে লালিত হইয়া পরে তিনি তাহাদের পণ্ডিতি বিদ্যা সংক্রান্ত সূক্ষ্ম চুলচেরা তর্কের পদ্ধতি পরিত্যাগ করেন। তাঁহার বিচার-বিতর্কের পদ্ধতিতে আধুনিক ইওরোপীয় দর্শনের প্রবর্তক দেকার্ত-এর পূর্বাভাস পাওয়া যায়। তাঁহার রচিত ‘তহাফৎ-উল-ফিলাসফা’ (দার্শনিকগণের খণ্ডন) পাঠে বোঝা যায় তিনি প্রয়োগবাদী বা যুক্তিবাদী দর্শনের বিরুদ্ধেই তাঁহার অভিযোগ আনয়ন করিয়াছিলেন। কার্য-কারণ নীতির

অনিশ্চয়তা বিশ্লেষণ করিয়া তিনি প্রয়োগবাদী দর্শনের অসারতা প্রমাণ করেন। তাঁহার বিশ্লেষণের সহিত ইওরোপীয় দার্শনিক হিউমের বক্তব্য কিয়দংশে তুলনীয়।

 বিশুদ্ধ দর্শনের পথে মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম পদক্ষেপ করেন অলকিন্দী। তবে এ ক্ষেত্রে তিনি প্লাটিনাস-কৃত আরিস্তোতলীয় মনস্তত্ত্বের ভাষাকেই আরিস্তোতলের দার্শনিক মতবাদ বলিয়া ভ্রমে পতিত হইয়াছেন। তাঁহার মতবাদ অনুসারে যুক্তি ও প্রত্যাদেশের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব নাই। একটি অপরটির পরিপূরক মাত্র।

 আলফারাবীও (৮৭০-৯৫০ খ্রী) অলকিন্দীর মতই প্লাটিনাস-কৃত আরিস্তোতলের ভাষ্যকে আরিস্তোতলের ধর্মবিদ্যা বলিয়া ভুল করিয়াছেন। তিনি প্লাতো (প্লেটো) ও আরিস্তোতলের দর্শনের সঙ্গে ইসলামের সামঞ্জস্যবিধানের চেষ্টা করিয়াছেন। কার্য-কারণ নীতির বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে তিনি দেখাইয়াছেন ইহার কোনও নির্দিষ্ট সীমা নাই। এ জগতের প্রত্যেকটি বিষয়ই একাধারে কার্য এবং কারণও বটে। তাই এই পর্যায়ের চূড়ান্ত সীমায় আমাদের এমন একটি কার্যকে গ্রহণ করিতে হয়, যাহার পক্ষে স্থিতির জন্য অন্য কোনও কারণের প্রয়োজন নাই। এই সর্বশেষ কারণই স্বয়ং আল্লাহ্‌ তা’ আলা। তাঁহাকে জানার জন্য তর্কবুদ্ধি পর্যাপ্ত নয়। জ্ঞানের সর্বশেষ পরিণতিতে আমরা অজ্ঞাবাদে আসিয়া উপস্থিত হই। তবে তাহার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বুঝিতে পারি তিনিই এই বিশ্বের মূলাধার। এইভাবে তিনি সর্বশেষে মায়াবাদে আসিয়া উপস্থিত হন।

 আল্‌ফারাবীর পরবর্তী দার্শনিক ইব্‌নে মসকভৈর সর্বশ্রেষ্ঠ দান তাহার বিবর্তনবাদ। ডারউইনের বৈজ্ঞানিক মতবাদের দার্শনিক বীজ তাঁহার চিন্তায় পাওয়া যায়। তিনি প্রজাতির বিবর্তনের সূত্র বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন।

 ইব্‌নে মসকভৈর পরবর্তী কালে দর্শনশাস্ত্রের উল্লেখযোগ্য অবদান—ইব্‌নে মির্জার (৯৮০-১০৩৭ খ্রী) চিন্তারাজি। তিনি তাঁহার পূর্ববর্তী দার্শনিক অল্-কাবাবীর মত এই বিশ্বকে এক আধ্যাত্মিক সত্তা হইতে উৎপন্ন বিষয় বলিয়া ধারণা করেন নাই। তাঁহার মতে আত্মার মাধ্যমেই আধ্যাত্মিক ও জড় পদার্থের মিলন সম্ভবপর। বিশ্বে সব কিছুই অস্থায়ী। সুতরাং তাহার ভিত্তিমূলে স্থায়ী কিছুর ধারণা করা প্রয়োজন। এইসব অস্থায়ী সত্তাগুলি স্থায়ী সত্তার কার্যকারিতার ফলেই স্থায়িত্ব লাভ করে। তবে স্থায়ী ও অস্থায়ী সত্তা মূলে অভিন্ন, এবং আল্লাহ্ তা’ আলাই এ বিশ্বের বহুবিধ বস্তুর মূলাধার।

 পূর্বদেশীয় এইসব দার্শনিক মতবাদ ব্যতীত উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা ও স্পেন দেশে মুসলমানদের মধ্যে দার্শনিক চিন্তা

৭৮