বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ভারতকোষ - দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/৯৮

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
ঐসলামিক দর্শন
ঐসলামিক দর্শন

বিকাশ লাভ করে। এইসব দার্শনিকের মধ্যে ইব্‌নে হাজমের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। তাঁহার ধারণা ছিল, দর্শন-শাস্ত্র সমস্ত বিজ্ঞানের ভিত্তিস্বরূপ। দর্শনের মুখ্য উদ্দেশ্য ইন্দ্রিয়জ বিভিন্ন জ্ঞানের মধ্যে ঐক্যের প্রতিষ্ঠা। দেকার্ত-এর মত তাঁহার ধারণা, দর্শনশাস্ত্র পাঠের সূচনাতে সন্দেহের মাধ্যমেই অগ্রসর হইতে হইবে। ইব্‌নে হাজমের কৃতিত্ব প্রকাশ পাইয়াছে তাঁহার ধর্ম সংক্রান্ত মতবাদে। প্রকৃতপক্ষে জাহেরী মতবাদকে তিনিই সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

 ইব্‌নে হাজমের পরে আবু বকর ইব্‌নে বাজ্জাই সমধিক প্রসিদ্ধ। তবে তিনি দর্শনের দিক হইতে ছিলেন আল্‌ফারাবীর মতবাদের অনুসারী। ইন্দ্রিয়জ জ্ঞান সম্বন্ধে তাঁহার বক্তব্য এই: ইন্দ্রিয়গুলি আমাদিগকে বিভিন্ন স্তরের সম্বন্ধে জ্ঞান দান করে। ইহাতে সত্যের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় না। একমাত্র চিন্তার মাধ্যমেই আমরা আধ্যাত্মিক সারবস্তুগুলি সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করিতে পারি।

 ইব্‌নে বাজ্জার পরবর্তী চিন্তানায়ক ইব্‌নে তুমর্ত স্পেনদেশীয় লোক ছিলেন না, তিনি জাতিতে বার্বার ছিলেন। তাঁহাকে দার্শনিক না বলিয়া ধর্মনেতা বলাই সমীচীন। কারণ তিনি নিজেকে মেহেদী বলিয়া দাবি করিতেন। তাঁহার পরবর্তী দার্শনিক ইব্‌নে তুফায়েল ছিলেন মরমিয়াবাদী; ভাবাবেশের মাধ্যমেই সত্যলাভকে তিনি প্রকৃষ্ট পন্থা বলিয়া গণ্য করিতেন। সূফীরা যেমন ভাবাবেশে বিভোর হইয়া আল্লাহ্‌কে তাঁহার সিংহাসনের মধ্যে দেখিতে পায়, ইব্‌নে তুফায়েল তেমনই সর্বশক্তিমান বুদ্ধিকে প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর সঙ্গে কার্য-কারণ-পরম্পরা সূত্রে আবদ্ধ দেখিতে পাইতেন। তাঁহার রচনাবলীর মধ্যে ইব্‌নে হাই এক্‌জান সমধিক প্রসিদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে স্পেন দেশে মুসলিম চিন্তা-ধারার সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ইব্‌নে রুশ্‌দ (১১২৬-৯৮ খ্রী)। আরিস্তোতলের চিন্তাধারার অভিঘাতে মুসলমান মানসে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় বুদ্ধির যে দীর্ঘ আলোচনা চলিতেছিল তাহারই সর্বশেষ পরিণতি ইব্‌নে রুশ্‌দ-এর দর্শন। তাঁহার মতে, সক্রিয় বুদ্ধি বহির্জগৎ হইতে লব্ধ; সক্রিয় বুদ্ধি দ্বারাই নিষ্ক্রিয় বুদ্ধি জাগরিত হয়। এই কার্যকর বুদ্ধি দ্বারাই আমাদের সংখ্যাবহুল ব্যষ্টিজীবনের বুদ্ধিগুলির শক্তিলাভ হয়। তাঁহার ধারণা, ব্যষ্টিজীবনের নিষ্ক্রিয় বুদ্ধিও সক্রিয় বুদ্ধির মত ধ্বংসশীল নহে। প্রকৃতির জীবনস্বরূপ এক বিশ্বাত্মা রহিয়াছে। কাজেই ব্যষ্টিজীবনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই সে বুদ্ধির শেষ হয় না। কেবল মানুষের জীবনেই নহে, প্রত্যেক বস্তুতেই সেই বিশ্বাত্মার অংশ রহিয়াছে। এইভাবে আরিস্তোতলের দর্শনকে তিনি বিশ্বাত্মবাদে পরিণত করেন।

 স্বকীয়তার ক্ষেত্রে ইব্‌নে রুশদের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য মুসলিম দার্শনিক ইব্‌নে খল্‌দূন (১৩৩২-১৪০৬ খ্রী)। ইব্‌নে খল্‌দূন্‌ও স্পেনদেশীয় ছিলেন না, তিনিও ছিলেন উত্তর আফ্রিকাবাসী। সাধারণতঃ ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের দার্শনিক হিসাবেই ইব্‌নে খল্‌দূন প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন; কাল বা জ্ঞানের উৎস সম্বন্ধে তাঁহার ধারণার কোনও আলোচনা হয় নাই। বের্গসঁর মত কালকে তিনি অবিভাজ্যরূপে কল্পনা করিয়াছেন। তাঁহার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রয়োগবাদী। তাঁহার মতে, মানুষের আত্মার পক্ষে প্রয়োগনিরপেক্ষ জ্ঞান লাভ করা সম্ভবপর নহে। প্রয়োগের ফলে মানুষের জ্ঞান বিস্তৃত হয় এবং পরীক্ষিত হয়।

 ইব্‌নে খল্‌দূন্‌ই বোধহয় সর্ব প্রথম ইতিহাসকে বিজ্ঞানের শাখারূপে প্রতিষ্ঠা করিবার চেষ্টা করেন। এ বিশ্বে যেমন কার্য-কারণ-পরম্পরা নীতি রহিয়াছে, তেমনই ইতিহাসের পাঠ হইতে আমাদের সেই নীতি আবিষ্কার করিতে হইবে। সমাজের ক্রমবিকাশের ধারার বিশ্লেষণে ইব্‌নে খল্‌দূন্ যাযাবর জীবনের কথা প্রথম আলোচনা করেন। যাযাবর জীবনে মানুষের পক্ষে খাদ্য উৎপাদনই থাকে প্রধান লক্ষ্য, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কারণের ফলে পরে তাহারা ব্যবসায়ে লিপ্ত হয়। তবে এই একই কারণের ফলে তাহারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হইয়া একজন শাসকের অধীনে বাস করিতে বাধ্য হয়। এইভাবে বংশানুক্রমিক শাসনব্যবস্থার সৃষ্টি হয়। ক্রমে সমৃদ্ধির ফলে সেই মানুষের মধ্যেই আলস্য ও জড়তা দেখা দেয়। অলস অথচ উচ্চস্তরের লোকেরা—অপরের উপার্জিত সম্পদ শোষণ করিয়া কাল যাপন করে। পরবর্তী কালে সমাজের লোকেরা বিত্তশালী ও বিত্তহীন নামক দুইটি দলে বিভক্ত হয়। আবার ধর্মের সূত্রে শোষিত শ্রেণীকে একতাবদ্ধ করার চেষ্টা করিয়া ধনিক শ্রেণী বিফলমনোরথ হয়। সমাজের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে মার্ক্‌সীয় মতবাদের সহিত তাঁহার ইতিহাস-দর্শনের লক্ষণীয় সাদৃশ্য রহিয়াছে।

 দার্শনিক মতবাদ ব্যতীত সূফীদের মতবাদও এ ক্ষেত্রে আলোচনার যোগ্য। সূফী মতবাদের উৎপত্তি সম্বন্ধে বিভিন্ন ধারণা রহিয়াছে। ভারতীয় বৈদান্তিক বা বৌদ্ধ-ধর্মের প্রভাব, খ্রীষ্টান বা নব্য-প্লাতো মতবাদের প্রভাব, ইরানী প্রভাব তাহাতে রহিয়াছে বলিয়া বিভিন্ন মনীষী মনে করেন। সূফী মতে মানবাত্মার পক্ষে আধ্যাত্মিক উন্নতির উচ্চশিখরে আরোহণ করা সম্ভব। মানুষ তাহার কল্‌ব্‌ বা হৃদয়ে প্রতিফলিত জ্ঞানের মাধ্যমেই সত্যের সঙ্গে পরিচয় লাভ করিতে পারে। জ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তরে

৭৯