পাতা:মাঝির ছেলে - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়.pdf/১৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।

১১

মাঝির ছেলে

চাই। নিজেই তিনি নাগার কাছে কথাটা পাড়লেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নাগার সম্বন্ধে অনেক কথাই ততক্ষণে তিনি জেনে ফেলেছেন। তাই তিনি স্পষ্ট করেই বললেন, ‘খাওন দিমু যত খাওন চাস, পরন আর বেতন দিমু চাঁদের পোলারে যা দিতাম। কি কস, থাকবি?’

 নাগা বড় ভাবনায় পড়ে গেল। সে এখানে কাজ নিলে হারু মাঝি মুশকিলে পড়বে, অন্য একজন লোক তাকে রাখতে হবে এবং হয় লোকটিকে দিতে হবে বেতন, নয় দিতে হবে নৌকার আয়ের ভাগ। কিন্তু এদিকে হারু মাঝির কাছে থাকতে নাগার বড় কষ্ট। পেট ভরে খেতে দেয় না, কাপড় ছিঁড়লে কিনে দিতে চায় না, একটা পয়সা চাইলে পর্যন্ত মেজাজ তার গরম হয়ে ওঠে। নাগা সবে ভাত খেয়ে উঠেছে, একবার তাকে কিছু চাইতে হয়নি, যেচে যেচে কতবার যে তার পাতে ডাল তরকারি দিয়ে গেছে। শেষের দিকে তার রীতিমত লজ্জা করছিল। সবচেয়ে সে অবাক হয়ে গেছে তার খাওয়া দেখে সকলে সত্য সত্যই খুশি হয়েছে বলে। বাড়িতে একবারের বেশী দুবার জলের মত পাতলা ডাল একটু চাইলে হারু মাঝির বৌ মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠে, আর এখানে নিজে থেকে নানা ব্যঞ্জন বার বার তার পাতে দিয়ে যাদববাবুর বৌ বলেছেন, ‘খাইতে পারলে তবে স্যান্‌ মাইনষের রাইন্ধা বাইড়া খাওয়াইয়া সুখ।’

 খেতে পাবে, পরতে পাবে, বেতন পাবে। এ কাজ কি ছাড়া যায়? এদিকে যেভাবেই হোক খাইয়ে পরিয়ে হারু মাঝি তাকে ছেলেবেলা থেকে মানুষ করেছে, স্বার্থপরের মত তাকেই বা হঠাৎ ত্যাগ করা যায় কি করে?—‘কাইল আইসা কমু, কর্তা।’

 একজন চেনা মাঝির নৌকায় নাগা আটখামারে ফিরে গেল। চেনা মাঝির অভাব কাছাকাছির জায়গায় কখনো হয় না। তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। নদীতে সন্ধ্যা হয় মহাসমারোহে, নিঃশব্দ রঙীন সমারোহ। অস্ত যাবার সময় সূর্য যে রঙ ছড়িয়ে দেয়, ডাঙ্গার মানুষের কাছে সে রঙ থাকে শুধু আকাশে। নদীর মানুষ নদীতেও রং দেখতে পায়। আকাশের রং নিয়ে নদী যেন আকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে রাঙ্গিয়েছে।

 সন্ধ্যার স্টীমার আসতে দেরি নেই, হারু মাঝি নিশ্চয় জেটিতে