পাতা:মাঝির ছেলে - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়.pdf/৯৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

মাঝির ছেলে

৯২

কণিকার প্রতিমার মত জমকালো পুতুল সেজে থাকা নয়, সমস্ত খুঁটিনাটিতে সহজ স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস রূপার নেই বলে নাগার মাঝে মাঝে বড় আপসোস হয়। এটো থালা বাটির পরিষ্কার কোণে একটু হাত ঠেকালে রূপা সঙ্গে সঙ্গে হাত ধোয়, কিন্তু হাত না ধুয়ে অনায়াসেই নোংরা। হাতে খাবার জিনিস ধরে। সে নিজেও কি ধরে না? ধরে। হয়তো উকুন আছে রূপার মাথায়। তার মাথায় কি নেই? এখন নেই, কিন্তু কিছুকাল আগে ছিল। রূপা নোংরা, সেও নোংরা। গরীব মাঝির ছেলে মেয়ে বলে নয়, পয়সা লাগে না এমন অনেক পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা তাদের হয় নি।

 নিজে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবার চেষ্টা আরম্ভ করে নাগা দেখেছে, মাথার উকুন পোকার মত বড় বড় নোংরামির অভ্যাস ত্যাগ করা সহজ কিন্তু প্রত্যেক দিনের শত শত টুকিটাকি ব্যাপারের নোংরামি ছাড়া বড় কঠিন। তবু, সে ঠিক করে রেখেছে, বিয়ের পর রূপাকে পরিচ্ছন্নতা ' শেখাবে।

 কণিকাদের নাগা আটখামার পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এল। বিদায় নেওয়ার সময় কণিকার মাকে প্রণাম করতে তিনি মূর্থ গেয়ে মাঝির ছেলে নাগাকে আশীৰ্বাদ করে বললেন, “বেঁচে থাকে। বাবা-পারলে তোমায় আমি সঙ্গে নিয়ে যেতাম।”

 স্নেহ নাগার সহ্যু হয় না, স্নেহ তো সে পেয়েছে খুব কম। আন্তরিক স্নেহের তুচ্ছ প্রকাশও তার বুকে আবেগের ঘূর্ণি জাগিয়ে দেয়, স্নেহের কাঙালি শিশুর মত। মার কথা শুনে কণিকা যখন বলতে গে”, “কতবার আমাদের সঙ্গে আসতে বললাম”—আর বলতে গিয়ে হঠাৎ কেঁদে ফেলল। শহর যেভাবেই গড়িয়ে পিটিয়ে তৈরী করে থাক, ছেলে মানুষের মন তো, সে মন কেন সব সময় মেনে নেবে বাড়ীর মাইনে করা মাঝি বন্ধু নয়, তাকে ছেড়ে যেতে মন কঁদে না। নাগার দু'চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।. নিজেও পাছে যে কেঁদে ফেলে ভেবে এমন ভয় হ’ল নাগার।

 জাহাজ ঘাট ছেড়ে যাবার পর আকাশ থেকে ফোটা ফোটা বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করল আর সেই সুযোগে নাগাও কয়েক ফোটা চোখের জলকে চোখ