পাতা:মাধবীকঙ্কণ - রমেশচন্দ্র দত্ত.pdf/৭৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

করিতে লাগিল, নরেন্দ্র আর সহ্য করিতে পারিলেন না, একাকী মন্দিরপার্শ্বে উপবেশন করিয়া নিঃশব্দে রোদন করিতে লাগিলেন।

 আবার চিন্তা আসিতে লাগিল। নরেন্দ্রের দেশ নাই, গৃহ নাই, বন্ধু নাই, পরিজন নাই, নরেন্দ্র একাকী দেশে দেশে পরিভ্রমণ করিতেছেন, কেবল হেমের চিন্তাস্বরূপ নক্ষত্রের উপর দৃষ্টি রাখিয়া সংসারসমুদ্রে বিচরণ করিতেছেন। নিদারুণ শৈব! অভাগার একমাত্র সুচিন্তা, একমাত্র সুখস্বপ্ন দূর করিও না, এ নিদারুণ আদেশ করিও না। নরেন্দ্র অনেক ক্লেশ সহ্য করিয়াছে, আরও যে ক্লেশ আদেশ কর, সহ্য করিতে প্রস্তুত আছে। নরেন্দ্র যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করিবে, বীরমর্যাদা ত্যাগ করিবে, অন্নকষ্ট ভোগ করিতে সম্মত আছে, জগতের নিন্দাভার বহন করতে সম্মত আছে, অথবা সংসার পরিত্যাগ করিয়া সিংহ ব্যাঘ্রাদি জন্তুর সহিত ঘোর অরণ্যে জীবন অতিবাহিত করিতে সম্মত আছে শৈলেশ্বর। আদেশ কর, ইহাতে যদি পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়, নরেন্দ্র আজ্ঞা শিরোধার্য করিবে, ইহাতে যদি নরেন্দ্র মুহূর্তের জন্য সঙ্কোচ করে, করালবদনার সম্মুখে তাহার মস্তকচ্ছেদন করিও কিন্তু বাল্যকাল অবধি যে চিন্তা অবলম্বন করিয়া নরেন্দ্র জীবন ধারণ করিতেছে, যে আলোকস্তম্ভরূপ চিন্তার জ্যোতিতে নরেন্দ্র দেশে দেশে পরিভ্রমণ করিতেছে, নিদারুণ শৈব! সে চিন্তা দূর করিতে বলিও না। এখন হেম পরের গৃহিণী, তথাপি নরেন্দ্রের ভালবাসা বিস্মৃত হয় নাই, নরেন্দ্র তাহার চিন্তা ত্যাগ করিবে? নরেন্দ্র মুসলমান হইয়া যবনীকে বিবাহ করিবে? হেম তাহা শুনিবে? সে ভাবনা অসহ্য! প্রবঞ্চক শৈব! হিন্দু পুরোহিত হইয়া তুমি যবনীর পানিগ্রহণ করিতে উপদেশ দাও? বিধর্মী! কপটাচারিন্! দূর হও!

 আবার শৈলেশ্বরের গম্ভীর আদেশ মনে পড়িল, “হা নরেন্দ্রনাথ! আপনাকে ভুলাইও না, আমাকে ভুলাইবার চেষ্টা করিও না। যে ঘোর পাপে লিপ্ত হইয়াছে, তাহা বিশেষ করিয়া আলোচনা কর। শৈব মিথ্যাবাদী? পরনারী চিন্তা কি পাপ নহে? নরেন্দ্রনাথ, সাবধান! আপনি পাপে লিপ্ত হইতেছ, শৈব তোমার দোষ দেখাইয়া দিতেছেন, তাঁহার নিন্দা করিও না। নরেন্দ্রনাথ ভাবিয়া ভাবিয়া, সেদিন কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না।

 তিন দিন অতিবাহিত হইল, তৃতীয় দিবস রজনীতে নির্দিষ্ট সময়ের দুই দণ্ড পূর্বে নরেন্দ্রনাথ গহ্বরমুখে একাকী দণ্ডায়মান রহিয়াছেন এক-একবার এদিক ওদিক নিঃশব্দে পদসঞ্চারণ করিতেছেন, এক-একবার অন্ধকার আকাশের দিকে স্থিরদৃষ্টি করিতেছেন, আবার গহ্বরমুখে আসিয়া দণ্ডায়মান হইতেছেন। হস্তে নিষ্কাষিত অসি; আকৃতি স্থির ও গম্ভীর।

৭৩