পাতা:মাধবীকঙ্কণ - রমেশচন্দ্র দত্ত.pdf/৮৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

 হেমলতার বয়ঃক্রম এক্ষণে পঞ্চদশ বর্ষ হইবে, অবয়ব ক্ষীণ, কোমল ও উজ্জ্বল রূপরাশিতে পরিপূর্ণ, নয়ন দুইটি জ্যোতির্ময়, যুগল সুচিক্কণ ও সূক্ষ্ম, গণ্ডস্থল রক্তিমচ্ছটায় আরক্ত, মুখমণ্ডল উজ্জ্বল ও লাবণ্যময়। তথাপি যৌবনপ্রারম্ভে প্রফুল্লতা সে অবয়বে লক্ষিত হয় না, যৌবনের উন্মত্ততা মুখমণ্ডলে দৃষ্ট হয় না। বোধ হয়, যেন সেই সুন্দর ললাটে সেই স্থির চক্ষুদ্বয়ে সে সুচিক্কণ ওষ্ঠে অল্পকালেই চিন্তার অঙ্ক অঙ্কিত হইয়াছে। নয়নের উজ্জ্বল জ্যোতি ঈষৎ স্তিমিত হইয়াছে, মুখমণ্ডলের প্রফুল্প আলোকের উপর জীবনের সন্ধ্যার ছায়া বিক্ষিপ্ত হইয়াছে। যৌবনের সৌন্দর্য ও লাবণ্য দেখিতে পাইতেছি, কিন্তু যৌবনের প্রফুল্লতা কৈ? প্রফুল্লতা থাকিলে কি হেম এরূপ নম্রভাবে ধীরে ধীরে যাইত? ঐ ক্ষুদ্র নতশির পুষ্পটিকে তুলিয়া কি উহার দিকে ঐরূপ স্থরভাবে চাহিত? যে কৃষ্ণবর্ণ সুচিক্কণ কেশপাশে তাহার বদনমণ্ডল ও নয়নদ্বয় ঈষৎ আবৃত হইয়াছে, ধীরে ধীরে সযত্নে সরাইয়া দেখ, নয়নদ্বয়ে জল নাই তথাপি নয়নদ্বয় স্থির, শান্ত, যৌবনোচিত চপলতাশূন্য। নিকটে যাইয়া দেখ হেমলতা দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিতেছে না, তথাপি যেন ভারাক্রান্ত হৃদয় হইতে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস বহির্গত হইতেছে। অর্ধ-প্রস্ফুটিত কোরকে দুঃখকীট প্রবেশ করে নাই, তথাপি কোরক জীবনাভাবে যেন ঈষৎ শুষ্ক ও নতশির। জীবনের অরুণোদয় যেন মেঘচ্ছায়ায় বিমিশ্রিত।

 শৈবলিনীর বয়ঃক্রম পঞ্চবিংশবর্ষ হইবে। শৈবলিনীর বিধবা অবয়বে যৌবনের রূপ নাই, অনির্বচনীয় পবিত্র গৌরব আছে। মস্তক হইতে নিবিড় কৃষ্ণ কেশপাশ পৃষ্ঠদেশে স্থিত রহিয়াছে, ললাট সুন্দর, চক্ষু বিশাল ও শান্তুপ্রভ, মুখমণ্ডল গভীর অথচ কোমল অবয়ব উন্নত ও বিধবার শুভ্রবসনে আবৃত। শৈবলিনী হেমলতাকে কনিষ্ঠার ন্যায় ভালবাসিত, সস্নেহ-বচনে তাহার সহিত কথা কহিতে কহিতে ঘাটে যাইতেছিল। শৈবলিনীর জীবন যেন মেঘশূন্য, বায়ুশূন্য সায়ংকাল, গভীর নিস্তব্ধ, শান্ত।

 বাল্যকালে হেমলতা নরেন্দ্রনাথের মুখ দেখিলে ভাল থাকিত। যৌবন প্রারম্ভে নরেন্দ্রনাথ হেমলতার হৃদয়ে স্থান পাইয়াছিল, হেমলতা বুঝিতে পারে নাই কিন্তু তাহার হৃদয় নরেন্দ্রনাথপূর্ণ হইয়াছিল। যখন সেই নরেন্দ্রের সহিত চিরবিচ্ছেদ হইল যখন হেম আর একজনের সহধর্মিণী হইয়া প্রতিমাকে হৃদয় হইতে বিসর্জন দিতে বাধ্য হইল, তখন প্রেম কি পদার্থ, হেম বুঝিতে পারিল তখন মর্মভেদী দুঃখ আসিয়া হেমের হৃদয় বিদীর্ণ করিতে লাগিল। বালিকা সরলা নবোঢ়া বধূ, সে কথা কাহার কাছে বলিবে? সে দুঃখ কাহার কাছে জানাইবে?

 শৈবলিনী পঞ্চবর্ষের সময়েই বিধবা হইয়াছিল, শ্বশুরালয়েই থাকিত, কখন কখন ভ্রাতার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিত। শৈবলিনী তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমতী, দুই তিনবার

৮৬