পাতা:মানিক গ্রন্থাবলী.pdf/১০৩

উইকিসংকলন থেকে
Jump to navigation Jump to search
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
জননী

গিয়া শ্যামারও কান্না আসিত।

 মেয়েকে কোলে করিয়া পুরনো বাড়ির ছাদে নুতন ঘরে ঝকঝকে দেয়ালে ঠেস দিয়া শ্যামা বসিত, বুজিত চোখ। শ্যামার কি শ্রান্তি আসিয়াছে? আগের চেয়ে খাটুনি এখন কত কম, তাই সম্পন্ন করিতে সে কি অবসন্ন হইয়া পড়ে।

 শীতলের জেলে যাইতে যাইতে শীত কমিয়া আসিতে আরম্ভ করিয়াছিল, শীতলের জেলে যাওয়াটা অভ্যাস হইয়া আসিতে আসিতে শহরতলী যেন বসন্তের সাড়া পাইয়াছে। ধানকলের চোঙাটার কুণ্ডলী-পাকানো ধোঁয়া উত্তরে উড়িয়া যায়, মধ্যাহ্নে যে মৃদু উষ্ণতা অনুভূত হয়, তাহা যেন যৌবনের স্মৃতি। শ্যামার কি কোনোদিন যৌবন ছিল? কি করিয়া সে চারটি সন্তানের জননী হইয়াছে, শ্যামার তো তা মনে নাই! আজ সে দারুণ বিপন্ন, স্বামী তার জেল খাটিতেছে, উপার্জনশীল পুরুষের আশ্রয় তাহার নাই, ভবিষ্যৎ তাহার অন্ধকার, শহরতলীতে বন-উপবনের বসন্ত আসিলেও জীবনে কবে তাহার যৌবন ছিল, তা কি শ্যামার মনে পড়া উচিত। কি অবান্তর তার বর্তমান জীবনে এই বিচিত্র চিন্তা। মুমূর্ষুর কাছে যে নামকীর্তন হয়, এ যেন তারই মধ্যে সুর তাল লয় মান খুঁজিয়া বেড়ানো।

 জেলের কয়েদী বাপের জন্য যে মেয়ের চোখের জল, তাকে কোলে করিয়া স্বামীর বিরহে সকাতর হওয়া কর্তব্য কাজ, কিন্তু জননী শ্যামা, তুমি আবার ছেলে চাও, শুনিলে দেবতারা হাসিবেন যে, মানুষ যে ছি ছি করিবে।

 মামা বলে — এইবার উপার্জনের চেষ্টা শুরু করি শ্যামা, কি বলিস? শ্যামা বলে — কি চেষ্টা করবে? মামা রহস্যময় হাসি হাসিয়া বলে — দেখ না কি করি। কলকাতায় উপার্জনের ভাবনা। পথে ঘাটে পয়সা ছড়ানো আছে, কুড়িয়ে নিলেই হল।

 — একটা দুটো করে নোটগুলো বদলানো আরম্ভ করলে হয় না?

 — তুই ভারি ব্যস্তবাগীশ, শ্যামা! থাক না, নোট কি পালাচ্ছে? সংসার তোর আচলও তো হয় নি বাবু এখনো!

 — হয় নি, হতে আর দেরি কত?

 — সে যখন হবে, দেখা যাবে তখন, এখন থেকে ভেবে মরিস কেন?

 মামার সম্বন্ধে শ্যামা একটু হতাশ হইয়াছে। মামার অভিজ্ঞতা প্রচুর, বুদ্ধিও

১০৯