পাতা:মানিক গ্রন্থাবলী (প্রথম খণ্ড).pdf/১৮৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চ। তু কোণ থাকিতে পারে না। কিন্তু ঘুরিয়া ঘুরিয়া বার বার কাছে আসে। সরসী আর রাজকুমারের মুখের দিকে তাকায়, ঠোঁট কামড়ায়, হঠাৎ একটা খাপছাড়া কথা বলে, দুপদাপ পা ফেলিয়া চলিয়া ঘায় । সেদিন মনোরমার তিরস্কারের পর কালী কেমন বদলাইয়া গিয়াছে। মনোরমা যতটুকু সাজাইয়া দেয়। তার উপর সে নিজে নিজে আরেকটু বেশী করিয়া সাজ করে। গায়ে একটু বেশী সাবান ঘষে, মুখে একটু বেশী ক্রীম মাখে, একটু বেশী দামের কাপড় পরে । সরসী চলিয়া যাওয়ামাত্র সে বলিল, এই মেয়েটা এলে আপনি পৃথিবী ভুলে যান। এই মেয়েটা আবার কে কালী ? যার সঙ্গে এতক্ষণ গল্প করলেন-আপনার সরসী ? ওকে তুমি সরসীদি বলবে। আমার বয়ে গেছে। ওকে দিদি বলতে । মুখ উচু করিয়া ঠোঁট ফুলাইয়া সিধা হইয়া কালী মূৰ্ত্তিমতী বিদ্রোহের মত দাঁড়াইয়া থাকে, তার চোখ দুটি কেবল জলে বোঝাষ্ট হইয়া যায়। রাজকুমার অন্যমনে রিণির কথা ভাবিতেছিল, অবাক হইষা সে কালীর দিকে চাহিয়া থাকে। এতটুকু মেয়ের মধ্যে ভাবাবেগের এই তীব্রতা সে হঠাৎ ঠিকমত ধারণা করিয়া উঠিতে পারে না। কি উদ্দেশ্যে এবং কেন কিছু না ভাবিয়াই, সম্ভবতঃ আহত সকাতর শিশুকে আদর করার স্বাভাবিক প্রেরণার বশে, কালীর দিকে সে হাত বাড়াইয়া দেয়। কালীর নাগাল কিন্তু সে পায় না, দু'হাতে তাকে সজোরে ঠেলিয়া দিয়া কালী ছুটিয়া পলাইয়া যায়। সমস্ত দুপুর রাজকুমার বিষন্ন হইয়া থাকে। বাহিরে কড়া রোদ, ঘরে উজ্জ্বল আলো, রাজকুমারের মনে যেন সন্ধার ছায়া, আমাবস্যা রাত্রির ছদ্মবেশী আগামী অন্ধকার। একটা কষ্ট বোধও যেন সমস্ত শরীরে ছড়াইয়া পড়িয়াছে, রাত্রি জাগরণের পর যেমন হয়। রাত্রে সে তো কাল ঘুমাইয়াছিল, সমস্ত রাত ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া স্বপ্ন দেখিয়াছে ? বিকালে রাজকুমার রিণিদের বাড়ী গেল। দারোয়ানের কাছে খবর পাওয়া গেল স্যর কে, এল, বাড়ীতেই আছেন, সারাদিন একবারও তিনি বাহিরে যান নাই। রিণির অসুখ, দু’বার ডাক্তার আসিয়াছিল। অসুখ ? নীচের হলে গিয়া দা ৮াইতে রিণির ভাঙ্গা ভাজা গানের সুর রাজকুমারের কাণে ভাসিয়া আসে। তারপর হঠাৎ এত জোরে সে বাড়ীর দাসীকে ডাক দেয় যে তার সেই শেষ পর্দায় তোলা তীক্ষ্ম কণ্ঠস্বর যেন ঘরের দেয়ালে, ঘরের বাতাসে, রাজকুমারের গায়ে আঁচড় কাটিয়া যায়। ডাক্তারকে দু’বার আসিতে হইয়াছিল রিণির এমন অসুখ । আগাগোড়া সবটাই কি রিণির তামাসা ? কেবল তার সঙ্গে নয়, বাড়ীর লোকের সঙ্গেও সে কি খেলা Ջ. ԳՇ করিতেছে- তার বিকারগ্রস্ত মনের কোন এক আকস্মিক ও দুৰ্বোধ্য প্রেরণার বশে ? ধীরে ধীরে উপরে উঠিয়া রিণিকে দেখিবামাত্র এ সন্দেহ তার মিটিয়া গেল। রিণির সত্যই অসুখ করিয়াহে । তার চুল এলোমেলো, আচল লুটাইতেছে মেঝেতে, মুখে ও চোখে একশ’ পাঁচ ডিগ্রী জরের লক্ষণ। অথচ শুইয়া থাকার বদলে সে অস্থির ভাবে এদিক ওদিক করিয়া বেড়াইতেছে। এক পাশে চেয়ারে মরার মত হেলান দিয়া বসিয়া স্তর কে, এল হতাশভাবে তার দিকে চাহিয়া আছেন। রাজকুমারকে দেখিয়াও রিণি যেন দেখিতে পাইল না । কেবল স্যার কে, এল হঠাৎ জীবন্ত হইয়া উঠিলেন। চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া আসিয়া রাজকুমারের সামনে এক মুহূৰ্ত্তের জন্য দাড়াইলেন, রাজকুমারকে কিছু যেন বলিবেন । তারপর একটি কাথাও না বলিয়া নিঃশব্দে পাশ কাটাইয়া চলিয়া CCब्न् । ছোট বুকসেলফটির কাছে গিয়া একটি একটি করিয়া বই বাছিয়া মেঝেতে ছুড়িয়া ফেলিতে ফেলিতে রিণি গুনগুনানো সুর ভজিতে লাগিল । f3fs ! কে ? অ! রিণি একটু হাসিল, বোসো না ? বইগুলো একটু বেছে রাখছি।-যত বাজে বই গাদা হয়েছে। তোমার কি হয়েছে ? জর ? কিছু হয় নি তো । রাজকুমার বসিল । বই থাক রিণি। এখানে এসে বোস। রিণি চোখের পলকে ঘুরিয়া দাড়াইল।-দ্যাখো, হুকুম কোরো না বলছি। একশোবার বলিনি তোমায়, আমার সঙ্গে নরম। &বে কথা কইবে ? তোমরা সব্বাই আমায় নিয়ে মজা করো জানি, তা করে গিয়ে যা খুলী, আমার আপত্তি নেই, কিন্তু ভদ্রভাবে করবে- রেসপেক্টফুলি।-উ ? তাই বটে, ভুলে গিয়েছিলাম। কি যেন বললে তুমি ? রাজকুমার অত্যন্ত নরম সুরে বলিল, বোসে । সঙ্গে কথা আছে। রিণি আসিয়া পাশে বসিবার পরেও রাজকুমার তার দিকে চাহিয়া থাকে, কোন অনুভূতি হৃদয়ে আলোড়ন তুলিয়াছে বুঝিতে পারে না । কাছে আসিবার পর এখন রিণির চোখ দেখিয়া সে যেন বুঝিতে পারে তার কি হইয়াছে। রিণির চাহনি স্পষ্ট ভাবেই তার কাছে সব ঘোষণা করিয়া দেয়, কিন্তু মনে মনে রাজকুমার প্রাণপণে সে সংবাদকে অস্বীকার করে। তার মনে হয়, রিণির সম্বন্ধে এই ভয়ঙ্কর সত্যকে স্বীকার করিলে তার নিজের মাথাও যেন খারাপ হইয়া যাইবে । রিণি ব্লাউজের বোতাম লাগায় নাই, লুটানো কাপড় তুলিয়া রাজকুমার তার গায়ে জড়াইয়া দিল। ব্রিণির সঙ্গে এখন কথা বলা না বলা সমান, কোন বিষয়েই তার সঙ্গে আলোচনা করার আর অর্থ হয় না। তবু তাকে বলিতে C可f可怀