পাতা:মানিক গ্রন্থাবলী (প্রথম খণ্ড).pdf/৪৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


| | কিন্তু রাজি হইল না বিধান। একসঙ্গে দাৰ্জিলিং গিয়া থাকার কত লোভনীয় চিত্রই যে শঙ্কর তার সামনে আঁকিয়া ধরিল, বিধানকে বাকানো গেল না । যথাসময়ে শঙ্কর চলিয়া গেল সেই শীতল পাহাড়ী দেশে, এখানে বিধানের দেহ গরমে ঘামাচিতে ভরিয়া গেল । মনে মনে শ্যামা বড় কষ্ট পাইল। অভাব অনটনের অভিজ্ঞতা জীবনে তাহার পুরানো হইয়া আসিয়াছে, এমন দিনও তো গিয়াছে। যখন সে ভাল করিয়া দেহের লজ্জাও আবরণ করিতে পারে নাই, কিন্তু আজ পর্যন্ত চারটি সন্তানের কোন বড় সাধ শ্যামা অপূর্ণ রাখে নাই,- আকাশের চাদ চাহিবার সাধ নয়, শ্যামার ছেলেমেয়ে অসম্ভব। আশা রাখে না ; শ্যামার মত গরীবের পক্ষে পুরাণ করা হয়ত কিছু কঠিন এমনি সব সাধারণ সখ, সাধারণ আব্দার। বিধান একবার সাহেবি পোষাক চাহিয়াছিল, তাদের ক্লাশের পাঁচ ছ'টি ছেলে যে রকম বেশ ধরিয়া স্কুলে আসে, দোতালার ঘরের জন্য ইন্ট সুরকি কিনিয়া শ্যামা তখন ফতুর হইয়া গিয়াছে। তবু ছেলেকে পোষাক তো সে কিনিয়া দিয়াছিল। শ্যামার চোখে আজকাল সব সময় একটা ভীরুতার আভাস দেখিতে পাওয়া যায়। শীতলের উপরেও কোনদিন সে নিশ্চিন্ত নির্ভর রাখিতে পারে নাই, কমল প্রেসের চাকরীতে শীতল যখন ক্ৰমে ক্রমে উন্নতি করিতেছিল তখনও নয়, তবু তখন মনে যেন তাহার একটা জোর ছিল। আজ সে জোর নষ্ট হইয়া গিয়াছে। চােরের বৌ ? জীবনে এ ছাপ তাহার ঘুচিবে না, স্বামীর অপরাধে মানুষ তাহাকে অপরাধী করিয়াছে, কেহ বিশ্বাস করিবে না, কেহ সাহায্য দিবে না। সকলেই, তাহাকে পরিহার করিয়া চলিবে। যদি প্রয়োজনও হয় ছেলেমেয়েদের দু'বেলার আহার সংগ্ৰহ করিবার সঙ্গত উপায় খুজিয়া পাইবে না, বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন সকলে যাহাকে এড়াইয়া চলিতে চায়, নিজের পায়ে ভর দিয়া দাড়াইবার চেষ্টা সে করিবে কিসের ভরসায় ? বিধবা হইলেও সে বোধ হয় এতদূর নিরুপায় হইত না। দু’বছর পরে শীতল হয়ত ফিরিয়া আসিবে, হয়ত আসিবে না। আসিলেও শুষ্ঠামার দুঃখ সে কি লাঘব করিতে পরিবে ? নিজের প্রেস বিক্রয় করিয়া কতকাল শীতল অলস অকৰ্মণ্য হইয়া বাড়ি বসিয়াছিল, সে ইতিহাস শ্যামা ভোলে নাই। তবু তখন শীতলের বয়স কম ছিল, মন তাজা ছিল। এই বয়সে দু'বছর জেল খাটিয়া আসিয়া আর কি সে এত বড় সংসারের ভার গ্ৰহণ করিতে পরিবে ? নিজেই হয়ত সে उद्म श्वा १ांकित्व थiभांग्र। এক আছে মামা। সেও আবার খাটি একটি রহস্য, ধরা ছোয়া দেয় না। কখনো শ্যামার আশা হয় মামা বুঝি লাখপতিই হইতে চলিয়াছে, কখনো ভয় হয় মামা সর্বনাশ 8) করিয়া ছাড়িবে। সংসারে হ্যামা মানুষ দেখিয়াছে অনেক, এরকম খাপছাড়া অসাধারণ মানুষ একজনকেও তো সে স্থায়ী কিছু করিতে দেখে নাই। সংসারে সেটা যেন নিয়ম নয়। সাধারণ মোটা-বুদ্ধি সাবধানী লোকগুলিই শেষ পর্যন্ত টিকিয়া থাকে, শীতলের মত যারা পাগলা, মামার মত যারা খেয়ালী হঠাৎ একদিন দেখা যায়। তারাই ফাকিতে পড়িয়াছে। জীবন তো জুয়া খেলা নয়। স্কুল খুলিবার কয়েকদিন পরে শঙ্কর দাৰ্জিলিং হইতে ফিরিয়া আসিল । শ্যামার সাদর অভ্যর্থনা বোধ হয় তাহার ভাল লাগিত, একদিন সে দেখা করিতে আসিল শ্যামার সঙ্গেই। শ্যামা দেখিয়া অবাক, পকেটে ভরিয়া সে দাৰ্জিলিংএর কয়েক রকম তরকারি লইয়া আসিয়াছে। বিধান তখন দোকানে গিয়াছিল, হাতের কাজ ফেলিয়া রাখিয়া শ্যামা শঙ্করের সঙ্গে আলাপ করিল। বকুল নামিয়া আসিল নিচে, মা’র গা ঘোষিয়া বসিয়া বড় বড় চোখ মেলিয়া সে সবিস্ময়ে শঙ্করের দাৰ্জিলিং বেড়ানোর গল্প শুনিল। শুধু বিধানকে নয়, শঙ্কর বকুলকেও ভালবাসে। কেবল সে বড় লাজুক বলিয়া বিধানের কাছে যেমন বকুলের কাছে তেমনি ভালবাসা কোথায় লুকাইবে ভাবিয়া পায় না। পকেটে ভরিয়া সে কি শ্যামার জন্য শুধু তরকারিই আনিয়াছে ? মুখ লাল করিয়া বকুলের জিনিসও সে বাহির করিয়া দেয় ; কে জানিত দাজিলিং গিয়া বকুলের কথা সে মনে রাখিবে ? শ্যামা বড় খুসি হয়। সোনার ছেলে, মাণিক ছেলে। কি মিষ্টি স্বভাব ? আমি কাটিয়া শ্যামা তাহাকে খাইতে দেয়, তারপর রঙীন স্ফটিকের মালা গলায় দিয়া বকুল গল গল করিয়া কথা বলিতে আরম্ভ করিয়াছে দেখিয়া হাসিমুখে কাজ করিতে যায়, পাঁচ মিনিট পরে দেখিতে পায় দুজনে দোতলায় গিয়াছে। রাণীকে শোনাইয়া শ্যামা বলে, বড় ভাল ছেলে রাণী, একটু অহঙ্কার নেই। তারপর দোতলায় দুমদাম করিয়া ওদের ছুটিাছুটির শব্দ ওঠে, বকুলের অজস্ৰ হাসি ঝরণার মত নিচে ঝরিয়া পড়ে, এ ওর পিছনে ছুটিতে ছুটতে একবার তাহারা একতলাটা পাক দিয়া যায়, দুরন্ত মেয়েটার পাল্লায় পড়িয়া লাজুক শঙ্করও যেন দুরন্ত হইয়া ਚੇ | পরদিন বিধান স্কুলে চলিয়া গেলে শুগামা বিষ্ণুপ্রিয়ার সঙ্গে দেখা করিতে গেল । দাসী তখন সুন্নানের আগে বিষ্ণুপ্রিয়ার চুলে গন্ধ তেল দিতেছিল, চওড়া-পাড় কোমল লাড়িখানি লুটাইয়া বিষ্ণুপ্রিয়া আনমনে বসিয়াছিল শ্বেতপাথরের মেঝেতে, কে বলিবে সেও জননী। এত বয়সে ওর ঢং দেখিয়া মনে মনে শ্যামার হাসি আসে,-প্ৰথম কন্যার জন্মের পর ও অ’বার সন্ন্যাসিনী সাজিয়াছিল । আজ প্ৰতিদিন তিনটি দাসী মিলিয়া ওই স্কুল দেহটাকে ঘষিয়া মাজিয়া ঝকঝকে করিবার চেষ্টায় হয়রাণ হয়। গালে রঙটঙ দেয় নাক বিষ্ণুপ্রিয়া ?