পাতা:মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্র পঞ্চম খণ্ড.pdf/২১৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

২১৬

মানিক রচনাসমগ্র

 হারাধন বাস্তব বুদ্ধির লোক। সে বলে, বলি দামোদর, বাস তো ছাড়বে ও বেলা। খিদেয় পেট চোঁচোঁ করছে বাবা। খোরাকি বাবদ কী দেবে বলেছিলে, দাও দিকিনি, খেয়ে আসি।

 শুনে সকলের পেটেই খিদের জ্বালা চাড়া দিয়ে ওঠে, চাঁপার পর্যন্ত। সেই কোন সকালে গাঁ থেকে তারা খেয়ে বেরিয়েছে।


প্রতাপগড়ের একটিমাত্র বাস। প্রতাপগড়ের কাছাকাছি গিয়ে শাপুরে সবাই নামবে। দামোদরেরা বাসে উঠবার খানিক পরেই সাঙ্গোপাঙ্গ সঙ্গে নিয়ে রসুলও উঠে জাঁকিয়ে বসে। আদালতে এ পক্ষের আকস্মিক অচিন্তিত চালবাজিতে রসুলের রক্তে আগুন ধরে গিয়েছিল, ওরা কায়দা করে দিন ফেলে চালবাজিটা ব্যর্থ করে দেওয়ায় খেপে গিয়েছিল দামোদর। খুনোখুনি হয়ে যাওয়া কিছুই আশ্চর্য ছিল না। এখন সে দিশেহারা উন্মত্ত আক্রোশ আর নেই, এসেছে গভীর হিংসা আর ঘৃণা। আমি মরি মরব ওকে তো মারব, এই বেপরোয়া ভাবের বদলে দুজনের মধ্যেই জেগেছে নিজের কোনো ক্ষতি না করে অপরের সর্বনাশ করার কামনা—এমন কী পারলে অপরের সর্বনাশ থেকে নিজের কিছু লাভ করে নেবার সাধ। চাঁপা ঘোমটা টেনে ভালো করে ঢেকে ঢুকে বসে। বাসে তিনজন লালমুখো গোরা মদে চুর হয়ে বসে ছিল আগে থেকে, মাঝে মাঝে আড়ােচাখে সে তাদের দিকে তাকায়। রসুলের দিকে চোখ ফেরাতে তার সাহস হয় না।

 শহর থেকে বেরিয়ে রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে আসে। পিছন আর সামনে থেকে ধুলো উড়িয়ে রাস্তা কাঁপিয়ে লরি চলে যায়, শব্দ পেলেই বাসচালক কানাই গতি মন্থর করে যত পারে নর্দমার ধার ঘেঁষে সরে যায়, লরি পেরিয়ে গেলে গাল দিতে থাকে চাপা গলায়। চাঁপা বসেছে রাস্তার ভেতরের দিকের জানালায়—লরি কিছু দূরে থাকতেই সে নিশ্বাস বন্ধ করে চােখ বোজে।

 চোখ বুজে থাকার সময়েই একবার প্রচণ্ড আওয়াজের সঙ্গে সে ধাক্কা খেয়ে পাশের বুড়িকে নিয়ে নীচে পড়ে যায়। বাসটাও একটু কাত হয়ে থেমে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে।

 একজন গোরা চাঁপাকে পাঁজাকোলা করে তুলবার চেষ্টা করতেই সে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ে। দরজা দিয়ে বেরোবার জন্য প্যাসেঞ্জারদের তখন ঠেলা ঠেলি হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। দু-তিনজন দরজা থেকে সোজা নালায় গিয়ে পড়ে। কানাই গালাগালি বন্ধ করে চেঁচায়, ভয় নেই, ঠিক আছে! ভয় নেই, ঠিক আছে!

 ঠিকই আছে কলটা। ডাইনের মাডগার্ডটা শুধু ভেঙেছে আর বডির খানিকটা তুবড়ে ভেতরের দিকে দেবে গেছে। আর চার-ছ-ইঞ্চির জন্য বাসটা উলটে নালায় পড়েনি।

 নালায় যারা পড়েছিল নামতে গিয়ে তাদের একজনের হাত মচকেছে, হয়তো ভেঙেছে। সঙ্গী জল কাদা সাফ করে দিলে বাসে উঠে সে কেবলই বলতে থাকে, নম্বর নিয়েছ কেউ? নম্বর?

 আর একজন বলে, আরো মশায়, রাখুন নম্বর! নম্বর দিয়ে হবে কী?

 গাড়ি ছাড়বার আগে কানাই বলে, শালারা! যতটুকু উচিত তার চেয়ে এক ইঞ্চি যদি সরি—

 না না, গোয়ার্তুমি কোরো না হে। মাঝবয়সি মোটাসোটা একজন প্যাসেঞ্জার বলে।

 কীসের গোয়ার্তুমি? ভয় পেলেই ও শালারা মজা পায়। আমি জানি।

 বাইরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। খেত মাঠ জলায় আর আকাশে চোখ বুলিয়ে যেতে যেতে পড়ার ব্যথা ও দুর্ঘটনার আতঙ্ক চাঁপার মিলিয়ে আসে—নতুন আর একটা লরির আওয়াজ কানে আসার সময়টা ছাড়া। ধরে তুলবার ছলে মাতাল গোরাটার অভদ্র কুৎসিত স্পর্শটাই সর্বাঙ্গে ভয়ার্তা অস্বস্তিবোধের মতো রিরি করতে থাকে। একটা মুখ-ভাঙা বোতল থেকে ঢেলে ঢেলে ওরা আবার মদ খেতে শুরু করেছে। লরির ধাক্কা লাগার সময় বোতলের মুখটা বোধ হয় ভেঙে গিয়েছিল।