পাতা:মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্র পঞ্চম খণ্ড.pdf/২১৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

আজ কাল পরশুর গল্প

২১৭

 পাকুনিয়ার মোড়ে বাস আসে। আরও দুজন গোরা উঠে আসে। দুজন চাষাকে ধরে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আগের তিনজনের পাশে বসে কিচির মিচির কথা শুরু করে দেয়—একজন হাতের বোতলটা দেখায় তিনজনকে। তিনজন ঘন ঘন তাকায় চাঁপার দিকে, নতুন দুজন মাঝে মাঝে এদিক ওদিকে চোখ ফেরানোর সময়টুকু ছাড়া চাঁপার গায়েই চোখ পেতে রাখে।

 হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই একজন একতাড়া নোট বার করে চাঁপার দিকে বাড়িয়ে ধরে হাসে। দামোদর আর মহেশ্বর কটকটিয়ে তাকায়। রসুল ভ্রুকুটি করে নুরে হাত বুলোয়। চাঁপা তাড়াতাড়ি মুখ বার করে দেয় জানালা দিয়ে বাইরে। গাড়িসুদ্ধ লোক স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে।

 রসুলের মুখের ভাবটা দেখবার এমন জোরালো ইচ্ছা দামোদরের জাগে। তার কেবলই মনে হয়, তার এই অপমানে রসুলের মুখে নিশ্চয় শয়তানি পরিতৃপ্তির হাসি ফুটেছে। তাকবে না ভেবেও কখন যে সে তাকিয়ে বসে নিজেই টের পায় না। রসুলের মুখে হাসি নেই। কিন্তু তার দিকেই সে তাকিয়ে আছে অনুকম্পা মেশানো অবজ্ঞাভরা এমন এক মুখের ভাব নিয়ে যার অর্থ অতি সুস্পষ্ট। চুপচাপ অপমান সহ্য করার জন্য রসুল তাকে মনে করছে অপদার্থ, অমরদ কেঁচো। কানের কাছে ঝাঁঝাঁ করতে থাকে দামোদরের। তাড়াতাড়ি সে চোখ ফিরিয়ে নেয়।

 মনে মনে বলে, রও। টের পাবে। তোমায় যদি না আমি—কী করলে যে এ অপমানের প্রতিশোধ রসুল পাবে সে ভেবে পায় না।

 চাঁপার দিকে গোরাটার নোটের তাড়া বাড়িয়ে ধরার সবটুকু দোষ গিয়ে পড়ে রসুলের ঘাড়ে।

 রসুল ভাবে, গোরাটা যদি হাত দিত মাগিটার গায়ে! কী খুশিই সে হত! তাকে জব্দ করতে চালাকিবাজি খেলার মজাটা টের পেয়ে যেত ব্যাটারা। বলবে না ভেবেও আজিজের কানে কানে কখন যে সে কথাটা বলে ফেলে। আজিজ কনুই দিয়ে তার বুকে একটা খোঁচা মেরে হাসতে থাকে।

 আধখানা চাঁদ আকাশে উঠেই ছিল। দিনের আলোটা ম্লান হতে হতে এক সময় আধো জ্যোৎস্না হয়ে যায়। শাপুরের নির্জন রাস্তার মাথায় বাসটা থামলে রসুলেরাই আগে নেমে যায়।

 চাঁপা নামবার সময় একজন গোরা তার আঁচলটা চেপে ধরে, হ্যাঁচকা টান দিয়ে আঁচল ছাড়িয়ে চাঁপা হুড়মুড় করে বাস থেকে প্রায় নীচে গড়িয়ে পড়ে।

 আরও একটু দাঁড়িয়ে বাস ছেড়ে দেয়। তখন সেই চলন্ত বাস থেকে টুপটাপ করে নেমে পড়ে পাঁচজন গোরা।

 শাপুরের রাস্তা ধরে রসুলেরা তখন খানিকটা এগিয়ে গেছে। বড়ো রাস্তা থেকে শাপুর প্রায় আধক্রোশ তফাতে, আঁকাবাঁকা গাছপালা ঢাকা পথ। প্রথম বাঁকটা ঘুরবার সময় মুখ ফিরিয়ে রসুল দেখতে পায়, চাঁপারা জোরে জোরে পথ হাঁটতে শুরু করেছে, তাদের কয়েক হাত পিছনে আসছে গোরারা।

 বাসের শব্দ দূরে মিলিয়ে যায়। খেত মাঠ জলা জঙ্গলের মুখর স্তব্ধতা ঝমঝম করে চারিদিকে। তারই মধ্যে চাঁপার আর্তনাদ শুনে রসুল ও তার সঙ্গীরা থমকে দাঁড়ায়।

 কী হয়েছে তাদের বলে দিতে হয় না। ম্লান জ্যোৎস্নায় তারা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। দুটি মূর্তি ছুটে এসে তাদের পাশ কাটিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে উধাও হয়ে যায় গ্রামের দিকে—গােঁসাই আর ভুবন ঘোষ।

 হলধরও ছুটছিল, এদের দেখে সে দাঁড়ায়। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে ভাই সর্বনাশ! ছুটে এসো।

 অজিজ, বলে যা যা আচ্ছা হয়েছে।

 তখন বোধ হয় সরল সহজ হলধরের খেয়াল হয়, ওরা কারা এবং এরা কারা। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

 তার মুখ হাঁ হয়ে যায়। চাঁপার আর্ত চিৎকার শোনা যায় বেশি দূরে নয়।

 হাতের লাঠি শক্ত করে চেপে ধরে রসুল সঙ্গীদের বলে, চল যাই।

 অজিজ বলে, ওদের বন্দুক আছে।

 লাঠির কাছে বন্দুক? বলে রসুল ছুটতে আরম্ভ করে।