পাতা:মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্র পঞ্চম খণ্ড.pdf/২১৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।

রাঘব মালাকার [ পুরাণে বলে একদা নরবৃণী ভগবান স্নানরতা গোপিনীদের বস্ত্ৰ অপহরণ করে নিয়ে তাদের অন্তর পরীক্ষা করেছিলেন—বহুকাল পরে আবার তিনি...এবার অদৃশ্য থেকে তঁর প্রতিনিধিদের দিয়ে, সমগ্ৰ বাংলাদেশের নরনারীর বস্ত্ৰ অপহরণ করে নিয়ে, কী পরীক্ষা করে দেখছেন, তা তিনিই জানেন. তবে দুঃশাসনকে জব্দ করে বস্ত্ৰহীন হওয়ার নিদারুণ লজ্জা থেকে দ্ৰৌপদীকে তিনিই রক্ষা করেছিলেন, হে রাঘব মালাকার, জেলে বসে ফাটা কপালে মলম দিতে দিতে অন্তত সেই কথা স্মরণ করে মনকে সাস্তুনা দিয়ো-আশা করি এই ছোট্ট কাহিনিটি পড়ার পর আপনিও ঠিক এই কথাই বলবেন... ] রাঘব বাঁচবে কি মরবে। ঠিক নেই। লাঠির ঘায়ে মাথাটা তার ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। ফুলবাড়ির চৌমাথা থেকে নামমাত্র পথটা মাঠ জিলা বনবাদাড়ের ভিতর দিয়ে দুকেশ তফাতে মালদিয়া গিয়েছে। এই দুক্লোশের মধ্যে গা বলতে কিছু নেই, এখানে ওখানে কতগুলি কুঁড়ে জড়ো করা বসতি আছে মাত্র। হাটবারের দিন কিছু লোক চলাচল করে পথ দিয়ে, অন্যদিন সন্ধ্যায় পথটা থাকে প্রায় জনহীন। নির্জন হােক, পথটা নিরাপদ। গত কয়েক বছরের মধ্যে এ পথে কোনো পথিকের বিপদ ঘটেনি। বছর তিনেক আগে দিনদুপুরে একজনকে পাগলা শেয়ালে কামড়েছিল শোনা যায়। কেষ্টরামের পোড়া মাদুলি আর চুম্বকপাথরের চিকিৎসাতেও নাকি বঁচেনি। সাপটাপ হয়তো কামড়েছে দু-একজনকে ইতিমধ্যে, কুকুর হয়তো তেড়ে গেছে ঘেউঘেউ করে, গোরু শিঙ নেড়েছে। কিন্তু বিশেষ কিছু কারও হয়নি, কারণ হলে সেটা মানুষের মনে থাকত। রাহাজানির দু-একটা রোমাঞ্চকর কাহিনি শোনা যায়, কিন্তু কবে যে সে ঘটনাগুলি ঘটেছিল। কেউ বলতে পারে না, একেবারে ঘটেছিল। কিনা তারও কোনো প্রমাণ নেই। এ পথের আশেপাশের বস্তি-গাঁগুলিতে যাদের বাস, চুরি ডাকাতি তারা যদি করে, ধারেকাছে কখনও করে না। এ পথের একলা পথিকের গায়ে হাত দেয়া দূরে থােক, তাকে ভয় দেখাবার ভরসা পর্যন্ত ওদের নেই। ও রকম কিছু ঘটলে দায়ি হবে ওরাই। পুলিশও প্রমাণ খুঁজবে না, জমিদার কার্তিক চক্ৰবতীও নয়-দুপক্ষের শাসনে র্থেতো হয়ে যাবে ওরা, পুড়ে ছাই হয়ে যাবে তাদের কুঁড়েগুলি, বাতিল হয়ে যাবে আশেপাশে বাস করার অনুমতি। একবার সদরে টাকা নিয়ে যাচ্ছিল গোমস্তা রাধাচরণ, সঙ্গে ছিল দুজন পাইক। জন সাতেক লোক তাদের মারধোর করে টাকা কেড়ে নিয়ে যায়। পরে তারা ধরা পড়ে জেলে গিয়েছিল, ফুলবাড়ির পাঁচজন আর মালদিয়ার দুজন-পরে। দুদিকের চাপে রাঘবের আর কাছাকাছি আরও তিনচারটে বস্তি-গাঁয়ের মানুষেরা থেতো হয়ে যাবার পরে। পথ থেকে হাঁক এলে এরা সাড়া দেয়। ভীরু লোক দাবি করলে সঙ্গে পৌঁছেও দিয়ে আসে। এদিকে ফুলবাড়ি বা ওদিকে সড়কের মোড় পর্যন্ত। একলা ভীরু পথিকের ভালোমন্দের দায়িক ওরাই निों। শেষ বেলায় ফুলবাড়ি-মালদিয়া নামমাত্র পথ ধরে বেঁচেকা মাথায় দুজন লোক চলেছে মালদিয়ার দিকে। বেশভূষা বেঁচেকার আকার, বয়স, আর গায়ের রং ছাড়া দুজনের মধ্যে পার্থক্য