পাতা:মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্র প্রথম খণ্ড.djvu/৪৮৫

উইকিসংকলন থেকে
Jump to navigation Jump to search
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


bang labOOOkS. in পুতুলনাচের ইতিকথা 8br(? সেনদিদির ফুলের মতো শিশুকে দেখিয়া একটু কি মায়া হইল না। শশীর ? মায়া করার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি কি তার এমন ভাবে নষ্ট করিয়া দিয়া গিয়াছে কুসুম ? গম্ভীর বিষগ্নমুখে শশী স্নান করিতে গেল, সেনদিদির ছেলেকে কোলে করিয়া কুন্দ অদূরে আসিয়া বসায় ভালো করিয়া খাওয়া পর্যন্ত হইল না। শশীর। অল্পে অল্পে শরীরটা তাহার কিছু ভালো হইয়াছে, কী ক্ষুধাই আজ পাইয়াছিল! সমস্ত দুপুরটা শশী নিঝুম হইয়া রহিল। এবার কিছু করিতে হইবে তাহাকে, আর চুপ করিয়া থাকা নয়। আর গরমিল চলিবে না। স্তব্ধ দ্বিপ্রহরে নিস্তেজ শয্যাশায়ী শশীীর মনে অসংখ্য এলোমেলো ভাবনা বিস্ময়কবভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া আসিতে থাকে, কোমল মমতাগুলি আলগা ফুলের মতো ঝুরঝুর কবিয়া ঝাবিয়া যায়। আগুনের আঁচে সবস বস্তুর শুকাইয়া ওঠার মতো নিজে সে বৃক্ষ কঠোর প্রকৃতিব মানুষ হইয়া উঠিতেছে এমনই একটা অনুভূতি শশীর হয়। একেবাবে বেপরোয়া, নির্মম, অবিবেচক ! কুসুমের জন্য মন কেমন করিত শশীর ? বড়ো আকুলভাবে মন কেমন করিত ? এত বড়ো উপযুক্ত ছেলের মর্যাদায় ঘা দিয়া সে মনকে কী করিয়া দিয়াছে গোপাল যে সেই মন-কেমন-করাকে আজ হাস্যকর মনে হইতেছে? সে যে বাড়িতে বাস কবে অম্লানবদনে সেনদিদির ছেলেকে সেখানে গোপাল কেমন করি যা আনিল ? সেনদিদিকে মরোমরো জানিয়াও শশী যে তার চিকিৎসা করিতে যাইতে চাহে নাই গোপাল কি সে কথা ভুলিযা গিয়াছে? শশীর অভিমান এতই তুচ্ছ গোপালের কাছে, সে কী ভাবিতে না ভাবিবে সেটা এতখানি অবহেলার বিষয়! শশীর কাছে তার একটু সংকোচ করিবারও প্রয়োজন নাই ? ছেলের সম্বন্ধে এমনই ধারণা গোপালের যে সে ভাবিয়া বাখিয়াছে সেনদিদির ছেলেকে বাড়িতে আনিয়া পুত্ৰস্নেহে মানুষ করিতে থাকিলেও শশী চুপ করিয়া থাকিবে, গ্রাহ্যও করিবে না ? কে জানে, গোপালই হয়তো গ্রাহ্য কবে না। শশী চুপ করিয়া থাক অথবা গোলমাল করুক। পরদিন সকালে হাসপাতাল কমিটির মেম্বারদের কাছে শশী জরুরি চিঠি পাঠাইয়া দিল। শীতলবাবুর বাড়িতে সন্ধার পর কমিটির জরুরি সভা বসিল। শশী পদত্যাগ-পত্র পেশ করিল, ডাক্তারেব জন্য বিজ্ঞাপনেব খসড়া দাখিল কবিল, প্ৰস্তাব কবিল যে হাসপাতালের সমস্ত দায়িত্ব কমিটির সুযোগ্য প্রেসিডেন্ট শীতলবাবুর হাতে চলিযা যাক। কমিটির হতভম্ব সভোরা প্রশ্ন করিলেন, কেন শশী, কেন ? শশী বলিল, আমি গা ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এবার আর দ্বিধা নয়, গাফিলতি নয়। অনিবাৰ্য গতিতে শশীর চলিযা যাওয়াব আয়োজন অগ্রসর হইতে থাকে। হাসপাতাল সংক্ৰান্ত ব্যাপারগুলি শীতলবাবুকে বিশদভাবে বুঝাইয়া দেয, টাকা পয়সার সম্পূর্ণ হিসােব দাখিল করে, আর ভবিষ্যতের কার্যপদ্ধতি সম্বন্ধে কিছু কিছু নির্দেশও লিখিয়া দেয়। ডাক্তারের জন্য কাগজে যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হইয়াছিল তার জবাবে দরখাস্ত আসে। অনেকগুলি। কমিটির সভ্যদের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া তাদের মধ্যে কয়েকজনকে শশী দেখা কবিতে আসিবার জন্য পত্ৰ লিখিয়া দেয । সকলে খুঁতখুঁত করে, কেহ কেহ হায় হায় করিতেও ছাড়ে না। কোথায় যাইবে শশী, কেন যাইবে, সে চলিয়া গেলে কী উপায় হইবে গায়ের লোকের ? পাশ-করা ডাক্তারের দরকার হইলে আবার কি তাহাদের ছুটিতে হইবে বাজিতপুর ? সকলে কৈফিয়ত চায় শশীর কাছে, তার সঙ্গে তর্ক জুড়িবার চেষ্টা করে। শশী না দেয কৈফিয়ত, না করে তর্ক। মৃদু একটু হাসির দ্বারা অন্তরঙ্গতাকে গ্ৰহণ করিয়া প্ৰশ্নকে বাতিল করিয়া দেয়। তবু খবরটা প্রচারিত হওয়ার পর হইতে চারিদিকে এমন একটা হইচই শুরু হইয়াছে যে মনে মনে শশী বিচলিত হইয়া থাকে। কেবল ডাক্তার বলিয়া স্বার্থের খাতিরে তো নয়, মানুষ হিসাবেও মনের মধ্যে সকলে তাহাকে একটু স্থান দিয়াছে বইকী। সাধারণের ব্যাপারগুলিতে সে উপস্থিত থাকিলে